28 C
Kolkata
Thursday, August 5, 2021
Home অফবিট 'মেলা নেই জিলিপি আছে', শ্রীরামপুরের আড়াই প্যাঁচের আদিখ্যেতা না দেখলেই নয়

‘মেলা নেই জিলিপি আছে’, শ্রীরামপুরের আড়াই প্যাঁচের আদিখ্যেতা না দেখলেই নয়

‘কে বলেছে বাঙালির ধৈর্য নেই, বাঙালি লাইনে দাঁড়াতে চায় না’

শান্তনু কর্মকার: রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। – করোনার দাপটে নেই সেই প্রেক্ষাপট। টানা দু’বছর ধরে বন্ধ মাহেশের রথের মেলা। স্বভাবতই মন ভাল নেই শ্রীরামপুরের। করোনার দাপটে রথের দড়ি ধরে টানার সুযোগ থেকেও হতে হয়েছে বঞ্চিত৷ তথৈবচ মেলার হালও৷ তা বলে খাদ্য রসিক বাঙালি উলটো রথের দিন দাঁতে একটু জিলিপি কাটবে না, তা কি কখনও হয়?

- Advertisement -

কখখনো না৷ অগত্যা, উৎসবে যতি পড়লেও ভোজনে নয়! মেলা বসেনি, তবু শহরের অলিগলির আকাশ-বাতাসে জিলিপির ম ম গন্ধে মাতোয়ারা এলাকা৷ যেন জিলিপির আস্ত একটা মেলা বসেছে! হরেক রকমের, হরেক স্বাদের সেই গরম গরম জিলিপিকে কেন্দ্র করে মিষ্টি প্রিয় বাঙালির আদিখ্যাতাও না দেখলেই নয়৷ মুখে মাস্ক পড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন লম্বা লাইনে৷ ঘণ্টা খানেক দাঁড়াতে হবে শুনেও কেউই সরছে না লাইন থেকে, বরং উলোট পুরাণ! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে জিলিপ ক্রেতার ভিড়৷ লাইনও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে৷ সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি শুনে একজনের সরস মন্তব্য, ‘‘ভাল করে ছবিটা তুলুন৷ কে বলেছে বাঙালির ধৈর্য নেই, বাঙালি লাইনে দাঁড়াতে চায় না!’

আরও পড়ুন, কাঠগড়ায় লকডাউন-অনলাইন গেম, ছোটদের রথ বিক্রি কমেছে শ্রীরামপুরে

- Advertisement -

শ্রীরামপুরের জনান্তিকে একটা কথা প্রায় শোনা যায়৷ এখানকার জিলিপ নাকি মুখে দিলে মিলিয়ে যায়৷ তাই নাকি অ্যাত্তো লম্বা লাইন৷ খাসা সেই জিলিপির আসল রহস্য কি, কি এমন উপকরণে এখানে জিলিপি বানান কারিগরেরা৷ তারই হাল হকিকৎ তুলে ধরল খাস খবর৷

 

১. শ্রী জগন্নাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার

- Advertisement -

শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা পাঁচুবাবুর বাজারের পাশেই অবস্থিত এই দোকানটি। সারাবছর রসগোল্লা-পান্তুয়া থেকে শুরু করে বেকড রসগোল্লা-বাটারস্কচ সন্দেশ, সবই বিক্রি করেন। সকাল-সন্ধে ভিড় লেগে থাকে দোকানের সামনে। তবে রথযাত্রা থেকে উলটোরথ অবধি এককথায় শো স্টপার জিলিপিই। সব আকর্ষণের মূলে আড়াই প্যাঁচের এই ভাজামিষ্টি। দোকানের মালিক স্বপন বৈরাগী খাস খবরকে বলেন, ‘এই সাতটা দিন একেবারে দম ফেলা যায় না। অন্যান্য মিষ্টি কিনতে ভিড় তো আছেই। তবে, জিলিপির লাইন ছাড়িয়ে যায় ব্রিজ অবধি।’

 

মুখে দিলেই বোঝা যাবে। এঁদের জিলিপি বরাবরই পুরোনো ধাঁচের। মোটা দাঁড়ির জিলিপি অনেক্ষণ সময় দিয়ে ভাজেন। তারপর সেটা ডোবানো হয় ঘন রসে। তাড়াহুড়ো নেই, দরকারে অল্প অপেক্ষা করবেন মানুষ, তবু স্বাদের সঙ্গে আপোষ নয়। কিন্তু এই ঘন রস কিংবা মোটা দাঁড়ির জিলিপিই তো ডেকে আনতে পারে একাধিক রোগ। উত্তরে স্বপন বলেন, ‘আমরা গোটা বছরে এই একটা সপ্তাহই জিলিপি বানাই। অন্যান্য অনুষ্ঠানে মালপোয়া সহ অন্যান্য মিষ্টি হলেও জিলিপি বানানো হয় না। কাজেই যখন বানাই, তখন আর স্বাদে আপোষ করতে ইচ্ছে করে না৷আমরা প্রায় ২৫ বছর ধরে৷ বলে রাখি, শুরুতে মাত্র ২০ টাকা কিলো দরে বিক্রি করতাম। এখন দাম বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা প্রতি কেজি। তখনও কাটোয়া থেকে কারিগর এসে জিলিপি ভাজতেন, এখনও তাই। এখনকার দিনে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু তার জন্য আমরা স্বাদ বদল করব না।’

২. ফেলু মোদক

এই দোকানের সঙ্গে আলাদাভাবে পরিচয় করাতে হবে না। নিশ্চয়ই সবাই এই দোকানের সঙ্গে পরিচিত৷ তবে এই দোকানকে ঠিক শ্রীরামপুরের দোকান বলা চলে না। রিষড়া ফাঁড়ি থেকে বাঁশতলার দিকে এগিয়ে গেলে জি টি রোডের ধারেই এই দোকান। সারাবছর ধরে হাজার ধরনের মিষ্টি বানান। যন্ত্র দ্বারা প্রস্তুত রসগোল্লা থেকে শুরু করে স্ট্রবেরি চমচম। সমস্ত মিষ্টি পৌঁছোয় দেশ-বিদেশে৷ তবে রথ এবং উলটোরথের দিন এই দোকানের মূল আকর্ষণ সেই জিলিপিই।

এঁদের জিলিপি অন্যান্যদের মতো মোটা দাঁড়ির নয়, বরং বড্ড সূক্ষ। এতটাই সরু দাঁড়ি, যেন মনে হবে কেউ নকশা এঁকেছে। এখনও গাওয়া ঘি-তেই ভাজা হয় জিলিপি। জিলিপির রসও বিশেষ ভারী নয়৷ সময়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের চাহিদার কথা ভেবে এভাবেই বিবর্তন আনা হয়েছে মিষ্টি প্রস্তুতিতে৷

 

 

দোকানের মালিক অমিতাভ মোদক বলেন, ‘প্রায় ১৭৮ বছরের পুরোনো এই দোকান। জিলিপি নিয়ে যখন কথা উঠলই, আমি মনে করি, এটাও শিল্প। ঠিক যেভাবে রসগোল্লা নিয়ে গর্ববোধ করি আমরা, জিলিপি নিয়েও একইভাবে করা উচিত। আমাদের দোকানে এর আগে রথযাত্রা থেকে শুরু করে পুজো, জন্মাষ্টমী সহ বছরে মোট ১২ দিন জিলিপি ভাজা হত। তবে এখন সেসব অতীত। বছরে মাত্র তিনদিন বানানো হয় আড়াই প্যাঁচের এই মিষ্টি। রথযাত্রা, উল্টোরথ এবং জন্মাষ্টমী। এই তিনদিন ধরেই জিলিপি বানাই আমরা। আমার বাবা তথা পূর্বপুরুষরা চেষ্টা করেছেন দামের চেয়েও বেশি মিষ্টির গুণমানকে প্রাধান্য দিতে। আমিও তাঁদের দেখানো পথেই চলছি। জিলিপি ভাজার জন্য আলাদাভাবে কারিগরও রয়েছেন। তিনি সুদূর উত্তরপ্রদেশ থেকে আসেন আমাদের এখানে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এই মূল্যবৃদ্ধির বাজারে কলকাতা শহরে কেউ আমাদের মতো কম দামে ঘিয়ে ভাজা জিলিপি দিতে পারবেন না। কিন্তু যেহেতু আমরা মফস্বলে ব্যবসা করি, তাই মাত্র ২৫০ টাকা দরে জিলিপি বিক্রি করছি, এতে আমাদের লাভ তো হচ্ছেই না। বরং খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, আর্থিকভাবে ক্ষতিই হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বছরের এই দুটো দিন এভাবেই জিলিপি বানাই আমরা৷’

 

৩. বন্দনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার

মাহেশের শ্রী জগন্নাথ মন্দিরের পাশে লক্ষ্মীঘাট বাসস্ট্যান্ডের বিপরীতে অবস্থিত এই দোকানটি। এঁরা ফিউশনে বিশ্বাসী নন। দোকানে গেলে দেখা যাবে, এখনও সেই আগের পদ্ধতিতেই বানানো হচ্ছে রসগোল্লা, ছানাভাজা, চমচম। জিলিপির ক্ষেত্রেও বিষয়টা একইরকম। দোকানমালিক জানান, ১৯৭৮ সাল থেকে এভাবেই রথযাত্রা উপলক্ষে জিলিপি ভেজে চলেছেন তাঁরা। রথের দিন থেকে শুরু হয় জিলিপি বানানো। টানা একমাস এভাবেই জিলিপি ভেজে চলেন তাঁরা। সাধারণত মেলা যতদিন থাকে, ততদিন মানুষ সন্ধ্যায় জিলিপি খেতে চান। তাই বছরের এই একটা মাস ধরে জিলিপিতেই ধ্যানজ্ঞান সবটুকু দেন তাঁরা৷

যখন জিলিপি ভাজা শুরু করেছিলেন, তখন দাম ছিল মাত্র ১৩ টাকা প্রতিকেজি। আজ সেখানে দাম ১২০ টাকা। শুরুর দিকে শুধুই মেলায় আসা মানুষজন জিলিপি খেলেও এখন তাঁদের জিলিপি জনপ্রিয় গোটা এলাকায়। স্থানীয় ক্লাবের ছেলে ছোকরা থেকে শুরু করে সান্ধ্যভ্রমণে বেরোনো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, সকলেই পছন্দ করেন এই জিলিপি।

দোকানমালিকের কথায়, ‘আড়াই প্যাঁচে জিলিপি ভাজি ঠিকই, তবে খরিদ্দারের সঙ্গে সততা বজায় রাখি আমরা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভাজি, শেষ হয়, উঠে যাই। বাসি জিলিপিতে আমরা নেই। রসগোল্লার রসকে ব্যবহার করা হয় জিলিপি বানাতে। তাই মানুষ এতটা পছন্দ করেন।’

 

৪. লালবাড়ির জিলিপি (হাজরা)

এই নামটা শুনে হয়ত যে কেউ চমকে যাবেন। কেননা বর্তমানে শ্রীরামপুরে লালবাড়ি বলে কোনও কিছুরই অস্তিত্ব নেই। এমনকি, হাজরা নামের কোনও মিষ্টির দোকানই নেই। শহরের মানিকতলা অঞ্চলে দোস্ত লেনের বিপরীতে সারাবছরই মনিহারি সামগ্রী বিক্রি করেন তাঁরা। গুড়, চিড়ে, মুড়কি, মুড়ি, চাল-ডাল এইসবই আর কী।

তবে রথের সময়ই ভোল পালটে যায়। ইয়াব্বড় কড়াই এনে শুরু হয় জিলিপি ভাজা। এলাকার বড়বড় মিষ্টির দোকানকে টেক্কা দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় ওই দোকানের সামনেই। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে এই দোকানের পথচলা শুরু। তখন থেকেই প্রতিবছর এই সময়ে জিলিপি ভেজে চলেছেন তাঁরা। নিজেরাই স্বীকার করে নেন, তাঁদের জিলিপি অন্যান্যদের তুলনায় একটু বেশিই ভারী। অর্থাৎ রস কিংবা মিষ্টত্বে কোনও কার্পণ্য নেই। আগে একটি লাল রঙের পুরোনো বিরাট বাড়ির নীচে ছিল তাঁদের দোকান, লোকে বলত ‘লালবাড়ি’। এখন সেই বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হয়েছে, সাদা ধবধবে বহুতলে লালের কোনও চিহ্নই নেই। তবু তাঁদের জিলিপির মহিমা এমনই যে আজও লোকে একডাকে চেনে ‘লালবাড়ির জিলিপি’।

- Advertisement -

সপ্তাহের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদ

বাইক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত নিক, প্রিয়াঙ্কা পাড়ি দিলেন আমেরিকায়

মুম্বই: বলি অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এবং হলিউড পপ তারকা নিক জোনাসের প্রেম পর্বের খবর প্রায়শই পেজ থ্রির শিরোনামে থাকে। কেবলমাত্র বি-টাউনই নয় হলিউডেও বেশ...

EXCLUSIVE: ভয় দেখিয়ে জোর করে অর্ধনগ্ন ছবি তুলেছিল ওরা: প্রতারিত মডেল

পলাশ নস্কর, কলকাতা: টানা তিনদিনের লড়াই৷ অবশেষে ক্ষণিক স্বস্তি৷ বিপদের দিনে বড় দাদার মতো পাশে পেয়েছেন উর্দিধারীদের৷ ধরা পড়েছে অপরাধীরা৷ আইনের প্রতি বেড়েছে আস্থা৷...

সামনে আসতে চলেছেন নতুন মিঠাই

অর্পিতা দাস: বদলে যাচ্ছেন সকলের প্রিয় মিঠাই, নেই সেই শাড়ি হালকা গয়না বিনুনি করা লম্বা চুল, সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে সিদ্ধার্থ এমনকি দর্শকদের পুরোপুরি অবাক...

খালিহাতে কফি ডেটে যাননি শ্রীলেখা মিত্র, প্রকাশ্যে এল বিশেষ উপহারের ছবি

পূর্বাশা দাস: কয়েকদিন আগেই 'কফি ডেটে' গিয়েছিলেন শ্রীলেখা মিত্র। ডেটে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে ডেটিংয়ের ছবি সবই সামাজিক মাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছিলেন অভিনেত্রী। শ্রীলেখার এই...

খবর এই মুহূর্তে

নিখিলের বিদায় পর্বেই কি আসছে চৌধুরী পরিবারে নতুন অতিথি

অর্পিতা দাস: নিখিল ও শ্যামার জীবনে আসতে চলেছে এক নতুন মোড়। একদিকে নিখিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দর্শকদের মনে, অন্যদিকে চৌধুরী পরিবারে নতুন মানুষ...

দক্ষিণ ভারতে নতুন সিদ্ধার্থ, নতুন মিঠাই হলেন কে

অর্পিতা দাস: মিঠাই খুব শীঘ্রই যাত্রা শুরু করতে চলেছে দক্ষিণ ভারতে। জি তামিল এ শুরু হচ্ছে মিঠাই ধারাবাহিকের এর তামিল ভার্সন নিনাইথালেইনিক্কুম। তবে এই...

২০০ কেজির লোহার গেট চাপা পড়ে মৃত্যু সিকিউরিটি গার্ডের

ব্যারাকপুর: ২০০ কেজির লোহার গেট চাপা পড়ে মৃত্যু হল এক সিকিউরিটি গার্ডের৷ ঘটনায় আবাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে৷ নিহত সিকিউরিটি গার্ডের নাম...

উত্তরেও শোভন-বৈশাখীর ছায়া, বিজেপির জেলা সভাপতির পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলনে কর্মীরা

রায়গঞ্জ: বিজেপির জেলা সভাপতি বাসুদেব সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিজেপি কার্যালয়ে বিক্ষোভ দেখালেন দলের একাংশ কর্মী৷ তাঁরা দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতির অনুগামী হিসেবেই পরিচিত৷ ঘটনার...