33 C
Kolkata
Wednesday, June 19, 2024
Home রম্য রচনা বাজি বনাম বিস্ফোরক

বাজি বনাম বিস্ফোরক

সুজয় গুহ: এবারের দীপাবলিতে বাড়িতেই স্বহস্তে তুবড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্তে অটল যদু মিত্র। কাকা-জেঠাদের কল্যাণে ছোটবেলাতেই তুবড়ি নির্মাণের কলা কৌশল রপ্ত করেছিলেন যদুদা। জীবন যাত্রা পথের ভিন্ন ভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে মাঝে প্রায় বিশ বছর দীপাবলির রোশনাই ততোটা আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি হাতিবাগানের মিত্র বংশের একমাত্র নাতির মুখে। আমি রূপ, যদুদার বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন এই নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।

- Advertisement -

আরও পড়ুন: ডাক্তারির ক্র্যাশ কোর্স

চল্লিশ পেরোনো যদুদার সাধ, যত কষ্টই হোক সেই পুরোনো দিনগুলির আনন্দ খানিকটা যদি ফিরিয়ে আনা যায়। গত বছর কৌশিক যে তুবড়ি বানিয়েছিল সেটিকে অত্যন্ত নিম্ন মানের আখ্যা দিয়ে গগনচুম্বী, সুদৃশ্য, দীর্ঘস্থায়ী তুবড়ি বানানো নিয়ে প্রায় মনস্থির করেছেন আমাগো সর্বগুণসম্পন্ন যদু (দা)। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আজকের আড্ডা প্রমোদ বাজি। এরই ফাঁকে অর্কর পকেট হাতরে সিগারেটের প্যাকেটটা নিজেই বের করে নিলেন যদুদা। একটা মুখে দিয়ে বাকি প্যাকেটটা অর্ককে ফেরত দিয়ে হাত পেতে আগুন চাইলেন। অর্ক অগত্যা প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে লাইটারটা বিনা বাধায় যদুদার হাতে তুলে দিল।

- Advertisement -

সিগারেটটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে স্মৃতির অতীত ঘেঁটে তুবড়ি তৈরির উপকরণগুলি একাগ্রচিত্তে মনে করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে যদুদা কৌশিকের শরণাপন্ন হল। যদুদার ইশারায় কৌশিক যেন নিজেকে ধন্য মনে করল। বাজি বিশারদ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার বহুবিধ চেষ্টা করতে কসুর করল না। কৌশিক বলে চলল, শোনো আমাদের বাড়িতে তুবড়ি তৈরীর এই রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। বাবা কাকাদের যেভাবে দেখেছি আমি ঠিক সেভাবেই অনুসরণ করেছি। গতবার আমাদের তৈরি তুবড়ি তোমাকেও দিয়েছিলাম। তুবড়ি উৎপাদনের জন্য লোহা, সোরা, গন্ধক ও কাঠকয়লার প্রয়োজন হয়।

হঠাৎ যদুদার স্মৃতির আঁচে যেন ফুলকি এলো। যদুদা বিকৃত শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে কৌশিককে আর কিছু বলতে নিষেধ করল। কৌশিক যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকে যদুদা তুবড়ি তৈরীর পরবর্তী কলা কৌশল বলতে শুরু করল। লোহা ফুলকি সৃষ্টি করতে, গন্ধক তাপ বৃদ্ধি করতে, সোরা খোলের মধ্যে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে যাতে জ্বলন্ত লোহার ফুলঝুড়িগুলো আগ্নেয়গিরির লাভার মত সজোরে উৎক্ষিপ্ত করতে পারে। এর সাথে কাঠকয়লার মিশ্রণ আগুন দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করে। কিন্তু আমি এবার একটু অন্যরকম কিছু চাইছি বলে সিগারেটের পিছনটা দ্রুত টেনে শেষ করে ফেলল। মানে যাতে তুবড়ির উজ্জ্বলতা এবং উপরে ওঠার ক্ষমতা, রঙিন আলো এবং ঝলকানি আরও বেশি পরিমাণে নির্গত হয়। এর জন্য বেরিয়াম ক্লোরাইড কিংবা পটাশিয়াম ক্লোরাইড এর ব্যবহার যদি করা যায়, সেই ব্যাপারেই ভাবনা চিন্তা করছি।

শুনেই অর্ক লাফিয়ে উঠলো। বল কি যদুদা! পটাশিয়াম কিংবা বেরিয়াম ক্লোরাইড দুটোই সাংঘাতিক বিস্ফোরক। এর ব্যবহার করলে আর দেখতে হবে না। কোন কারণে যদি বিপদ ঘটে বাড়ি শুদ্ধু জ্বলে খাঁক হয়ে যাবে।

- Advertisement -

মণিমাধব সান্যাল মন দিয়ে সব শুনছিল। অর্কর কথা শুনে হঠাৎ যেন মণিদার মাথায় ইলেকট্রিকের শক লাগলো। মণিদা প্লাস্টিকের ভাঙ্গা চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখ করে বলল যদু তুমি দেখছি একটা অঘটন না করে ছাড়বে না। এই কদিন আগেই পূর্ব মেদিনীপুরের এগড়ার সাহারা গ্রামে ভয়ংকর বাজি বিস্ফোরণে হতাহতের সংখ্যা ডজন ছাড়িয়েছে, ভুলে গেলে নাকি। এইসব বিস্ফোরণ গুলির তীব্রতা এত বেশি ছিল যে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এদিক ওদিক উড়ে গিয়েছিল। আমার এক পরিচিত সবুজ প্রমোদ বাজি নির্মাতা বলছিল বাজি তৈরিতে কখনোই পটাশিয়াম ক্লোরাইড বা বেরিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার করা উচিত নয়। শুধু তাই নয় এই বাজি তৈরির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট নিয়মাবলী রয়েছে।

মণিদার মূর্তি দেখে অর্ক যেন একটু সাহস পেল। না হলে চট করে যদুদার মুখে লাগা যে কত বড় বিপদ তা নিকট অতীতে বহুবার টের পেয়েছে অর্ক। বলল, শোনো বেরিয়াম হোক পটাশিয়াম যখনই তা ক্লোরিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে মৌল থেকে যৌগে পরিণত হয় তখন তার ধ্বংসাত্মক এবং বিস্ফোরণের ক্ষমতা, তীব্রতর হয়। পারমাণবিক সংখ্যা অনুযায়ী পটাশিয়াম এবং বেরিয়াম অনেক শক্তিশালী। এর ইলেকট্রন-প্রোটন বিন্যাস এবং অ্যাটোমিক মাস এর অনুপাত যে কোন মৌলের থেকে বেশি। সাধারণত অ্যাটোমিক মাসের অনুপাত ১.৫ বা এর বেশি হলেই তা বিস্ফোরকে পরিণত হয়। আর এক্ষেত্রে বেরিয়াম বা পটাশিয়ামের সঙ্গে ক্লোরিনের মিশ্রণ সেই অনুপাতকে ত্বরান্বিত করে বেরিয়াম ক্লোরাইড এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড যৌগ বিস্ফোরকে রূপান্তরিত হয়।

মণিদার উচ্চস্বরে আস্ফালন সঙ্গে অর্কর বৈজ্ঞানিক যুক্তি কোন কিছুই যদুদাকে দমাতে পারল না। ভাবখানা এমন, যেন তুবড়ি তৈরীর প্রতিযোগিতায় নিজের প্রাণ যদি বিসর্জন দিতে হয় তাতেও যদু মিত্র রাজি। উল্টে সবাইকে ধমক দিয়ে বলল, রাখো তো ওসব বাজি বিস্ফোরণের ব্যাপার-স্যাপার। পটাশিয়াম বা বেরিয়াম এর ব্যবহার যখন করা উচিতই নয় তখন এত এত বাজি বিস্ফোরণ ঘটছে কি করে। বাজি তৈরিতে পটাশিয়াম কিংবা বেরিয়ামের উপস্থিতির কথা নিশ্চয়ই সব মহলই জানে। তাহলে এত সংখ্যক মানুষের প্রাণ বলি দিচ্ছে কারা। অথচ আমরা দেখছি প্রতিটা ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যাচ্ছে এর ব্যবহারকারীরা। বাজি তৈরীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়মাবলী যদি থেকেই থাকে তার অপব্যবহারে মানুষের প্রাণহানিতে বাজি প্রস্তুতকারকেরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন কিভাবে? যেভাবে যে যে ধারায় মামলা সাজাচ্ছে পুলিশ তাতে ছমাসের মধ্যেই এইসব বাজি কারখানার মালিকরা বেকসুর খালাস হয়ে যাচ্ছে।

খাস খবর ফেসবুক পেজের লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/khaskhobor2020/

মনি মাধব সান্যাল যদু মিত্রর যুক্তিগ্রাহ্য কথাগুলি শুনে আস্তে আস্তে নরম হয়ে সেই ভাঙা চেয়ারটিতেই ফের উপবিষ্ট হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ঠিকই বলেছ যদু, বছরের অন্তত কয়েকবার এইসব বাজি কারখানায় বিস্ফোরণ হয়। যাতে এইসব মারাত্মক ধ্বংসাত্মক রাসায়নিক যৌগের ব্যবহার হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দিষ্ট বাজী তৈরীর নিয়মাবলী উপেক্ষা করেও এরা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে দিনের পর দিন তাদের ব্যবসা চালিয়ে যায়। এরপরও আমাদের প্রশাসন আইপিসি ১৮৮,২৮৬, ৩০৪ ধারায় এবং দমকল আইনের ২৫, ২৬ নম্বর ধারায় (১৮৮ ধারা: সরকারি নির্দেশ অমান্য করে একই অপরাধ সংগঠিত করা এবং তার জন্য এলাকায় অশান্তি। ২৮৬ ধারা: বিস্ফোরক ব্যবহার, তার ফলে অবহেলা জনিত কারণে মানুষের ক্ষতি। ৩০৪ ধারা: অনিচ্ছাকৃত খুন। সাজা: সর্বাধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। দমকল আইনের ২৫ নম্বর ধারা: অনুমতি ছাড়া রকেট, একই জাতীয় কিছু জিনিস যেতে দেওয়া। ২৬ নম্বর ধারা: অনুমতি ছাড়া বাজি কারখানা খোলা।) মামলা করায় অপরাধীরা পুনঃ পুনঃ নিষ্কৃতি পায়। আমরা বারবারই বলি, এটা অনিচ্ছাকৃত খুন। আসলে আমরা জানি এগুলি সবই অতিরিক্ত মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে সমস্ত রকম নিয়মের উপেক্ষা করে এক পরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত মানব হত্যা। কোনটা প্রমোদ বাজি আর কোনটা বিস্ফোরক সেই পার্থক্য ভুলেছি আমরা। এখন দেখো তুমি কি করবে। আশা করি প্রমোদ বাজি আর বিস্ফোরকের ফারাক নিশ্চয়ই তুমি বুঝেছ।

এরপর যদু মিত্র কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ল। যদিও কুড়ি বছর পর এবারের দীপাবলিতে যদু মিত্র ফের তুবড়ি বানাবে কিনা সে চিত্র পরিষ্কার হলো না। বলা বাহুল্য, সে দিনের আসরের বাকবিতণ্ডার মাঝে পড়ে যদুদার হাতের স্পেশ্যাল নিমতিতা চা’টা খাওয়া হলো না।

- Advertisement -

সপ্তাহের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদের সকালেই পথ দুর্ঘটনায় মৃত ২

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতাঃ একদিকে ঈদ পালনে মশগুল শহর তথা রাজ্য। এরই মধ্যে অন্যদিকে দুর্ঘটনার খবর শিরোনামে। সোমবার সকালেই পথ দুর্ঘটনায় (Road Accident) মৃত্যু। জানা...

কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার জেরে একাধিক ট্রেনের গতিপথ বদল

কলকাতাঃ কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার জেরে গতিপথ বদল একাধিক ট্রেনের। ভোগান্তিতে যাত্রীদের একাংশ। রেলের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী দার্জিলিং এর দুর্ঘটনার কারনে রাজধানী এক্সপ্রেস, বন্দেভারত সহ...

মানিকতলায় পুরানো মুখেই আস্থা, উপনির্বাচনে চার কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা বিজেপির

কলকাতা: উপনির্বাচনেও(Assembly By Election ) একের পর এক চমক। বাংলার চার কেন্দ্রে হবে উপনির্বাচন। আগেই  তৃণমূল চার কেন্দ্রে  প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে দিয়েছে। বামেরাও...

Exclusive: “এখনই কিছু বলার নেই, জেনারেল মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে”, সত্যজিতের মন্তব্যে জল্পনার সৃষ্টি

বিশ্বদীপ ব্যানার্জি: সৃঞ্জয় সরলেন। এলেন কে‌? মোহনবাগান সচিব পদে সত্যজিৎ চ্যাটার্জি এবং ডিরেক্টরের ভূমিকায় সৃঞ্জয় বসুরই ভাই সৌমিক বসু। সত্যজিৎ ছিলেন সহ সচিব। কার্যকরী...

খবর এই মুহূর্তে

টোপ টাকার বান্ডিল, টার্গেট বয়স্ক মহিলারা

অতনু ঘোষ, মেমারি: নকল টাকার বান্ডিল৷ ওপরে কিছু ১০০ টাকা বা ৫০০ টাকার নোট দিয়ে আটকানো ওই বান্ডিল৷ আর ভিতরে কিছু নকল টাকা ও...

নিটে সাফল্যের পরও অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ, অপেক্ষায় আদালতের রায়ের

রাকেশ সেখ,মথুরাপুর: ২০২৪ এর সর্বভারতীয় ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট ইউজিতে সাফল্য লাভ করার পরও অন্ধকারে কৃষ্ণচন্দ্রপুরের স্নেহা নাটুয়া ভবিষ্যৎ। প্রবল আর্থিক সংকটের মধ্যেও কোন...

জলবায়ুর বেহাল অবস্থাতেও সচল কৃষিব্যবস্থাতে পথ দেখাবে কেন্দ্র

দেবাশীষ মন্ডল, উত্তর ২৪ পরগনাঃ বর্তমান আবহাওয়ার পরিস্থিতি ও জলবায়ুর পরিবর্তন কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে প্রতিনিয়ত। যার জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও। অধিকাংশ...

দলবদলের জল্পনা নিয়ে এবার মুখ খুললেন সৌমিত্র খাঁ

সঙ্গীতা পাত্র ও মনোজ কর্মকার, বাঁকুড়াঃ একের পর এক বিতর্কিত আচরণ! রাজনৈতিক মহলে এখন সৌমিত্র খাঁ-(Soumitra Khan)এর নাম শিরোনামে। কখনো প্রাক্তন স্ত্রী তথা তৃণমূল...