কই রে আগের মানুষ কই..

0
106

খাসখবর ডেস্ক:  রাজনীতিতে কিছু মানুষ আসেন যাদের ভোলার পরিণাম ও তাদের অভাব গোটাদেশ কে দিতে হয়। রাজনীতি ও আইনের জাতীয় স্তরে এক সর্বজনগ্রাহ্য উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং যাঁর চলে যাওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা, তার মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর অংশ চলছিল। আমি আমার মতো করে যেটা জানি বা বুঝি সে টুকুই বলবো।

ভবানীপুর মিত্র স্কুলের ইতিহাসের মাস্টার মশাই সুশীল বাবুর কথা ছিল উনি ওই স্কুলের অহংকার ছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলেবেলার স্কুলকে ভোলেননি। সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন সর্ব ক্ষেত্রে। আজ একথা অবান্তর যে কে কাকে বাধিত করেছে। CPI(M) সোমনাথ বাবু কে ? না সোমনাথ বাবু CPI (M)কে। সোমনাথ বাবুর পার্টি তে যোগদান নিশ্চয় ১৯৭৭ সনের পরে নয়। যে সময় টা তিনি কোলকাতা উচ্চ আদালতের প্রথম সারির আইনজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত এবং যে সময় অনেক উচ্চ মধ্য বিত্ত মানুষদের কোনও মামলায় তাঁকে নিয়োগ করা স্বপ্ন সম ছিল।

বিশেষ করে সেই সময়ে তাঁর পারিশ্রমিকের অঙ্ক যা ছিল, তা স্বতঃতে ও সেই সময় টা তে তিনি শ্রমিক শ্রেণীর মামলা বিনি পয়সায় করেছেন। যে সময় মাননীয় সুপ্রিম কোর্টে অশোক সেন, ডঃ দেবী পাল ও সোমনাথ বাবুদের নাম একই সম্ভ্রম ও মর্যাদায় উচ্চারিত হতো তখনকার দিনে লক্ষ টাকার রোজগার বিসর্জন দিয়ে সংসদে পার্টির সর্ব ভারতীয় মুখ হয়েছিলেন। কিছু লোক বলছেন পার্টি কম সুযোগ দেননি সোমনাথ বাবুকে ওই উচ্চতায় পৌঁছতে। আমি ভাবি হিরেন মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, জ্যোতির্ময় বসু প্রমুখ বাদ দিলে বাম গণতান্ত্রিক দলের রিজার্ভ বেঞ্চে সোমনাথ বাবুর মতো ক্ষুরধার মেধাবী বক্তা ও আইনজীবী কজন বসে ছিলেন?

ওই মানের সংসদ একজন ও এখন গোটা সংসদ এ নেই।কথা উঠেছে দল শৃঙ্খলার প্রশ্নে ওনাকে বহিষ্কার করেছে। দল কাকে বলে? সংখ্যা গরিষ্ঠ উচ্চ আসনে নীতি ঠিক করা মানুষ গুলোর মতামত দলীয় মত বলে পরিগণিত হয়। সেটা সত্যের সংজ্ঞা না হলেও, সেই সময়কার জন্য ক্ষমতার সূচক। যে দল সংবিধান অনুযায়ী ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী গণতন্ত্রের নিশির হাতছানি তে খেলতে নেমেছেন; সে তো জেনেই নামলেন যে সংবিধানের সব নিয়ম মানতে হবে, কারণ পার্টির গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচিতে স্পিকার পদের কোনও কথা বলা আছে বলে জানি না।

স্পিকার সভা পরিচালনার সময় একটা সংকট কালে সংসদ ছেড়ে এসে দলীয় কার্যালয় এ সীতার মতন অগ্নি পরীক্ষায় বসবেন? যাঁরা ওনার পদ ছাড়াবার জন্য রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির কারণে জেদ করেছিলেন, তাদের দুরিদৃষ্টিতার নজির বর্তমান সময় দিচ্ছে। দল কতটা বাড়ল ও প্রাসঙ্গিক হল সেটাও সময় জানান দিচ্ছে। বলা যেতেই পারে আজ হয়নি কিন্তু আন্দোলন অসন্তোষ যে ভাবে দানা বাঁধছে খুব শীঘ্রই এক মহীরুহে দল পরিণত হবে। খুব আনন্দের খবর হবে। কারণ ভারতে গরিব মানুষের সংকট আছে আন্দোলন আছে অথচ CPI(M)এর মত দল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে, এটা খুব কষ্টের।

হয়ত সেদিন পৃথিবীর সব রঙ মুছে গেলেও জেদ ও অহংকার ছাড়বো না এমন কিছু একটা হয়েছিল। সেদিন সোমনাথ লাশ কাটা ঘরে শায়িত, কিন্তু তাঁর মেধার ঝলসানো আলো রয়ে যাবে তাদের কাছে যারা দেখেছেন। দল ছাড়বার পর শুনেছি বহু শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব তাকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদে অলংকৃত হবার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন, সবিনয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনতর দলবিরোধী ও আকাঙ্খার অসুখে সেদিন আক্রান্ত ছিলেন নাকি সোমনাথ!

সোমনাথ বাবুরা জানতেন দেশ ও সংবিধান কি দেশের মানুষ নিজেদের এই চলমান রক্তসংবহন তন্ত্র নিজেরাই নিজেদের দেশ চালানোর জন্য উপহার দিয়েছেন। উনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে এ কথা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু ওই ক্ষতি রিপ্লেস করা যায় নি, সংসদে। আমি আমার ব্যক্তি গত মত বললাম। বাঙালি বাম পন্থী নেতা যিনি ওই সময়ে জ্যোতি বাবু ও উপরি উল্লিখিত আপনি জানতেন সংসদে আস্থা। আপনার বিশ্বাস ছিল সংসদ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ।

গুপ্তচর বৃত্তি করে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাগ করে , আইনের অনুশাসন হয় না এমন টাই মানতেন আপনি। ব্যক্তিদের বাদ দিলে, খুব সর্ব গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে। দল নয়, দেশ ও দেশের চিন্ময়ী মানুষ বড় হয়েছিল ওই মানুষ টার কাছে। He understood the meaning of ” we the people of India” গোটা দেশ তাঁর মৃত্যুতে শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াল। শেষ যাত্রায় তিনি দেশমাতৃকার সন্তান হিসাবেই তাঁর মাতৃভূমিতে শায়িত।

(লেখক আইনজীবী এবং সমাজকর্মী কল্লোল বসু)