দিদির জমানা: ‘শোবো, কিন্তু কেউ যেন জানতে না পারে’

এর সুফল অনেকটা সেই সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী, রূপোশ্রী কিংবা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো রাজ্যের ‘জনকল্যাণমূলক’ প্রকল্পের সমান! ‘শোবো, কিন্তু কেউ যেন জানতে না পারে’ টাইপের টিপিক্যাল বাঙালি কালচার! একান্তে সরকারের সুফল গ্রহণ করব। কিন্ত প্রতিবেশী যেন না জানতে পারে! ভাবখানা এমন, সাত কিংবা পাঁচ, কোনওটাতেই নেই। এদিকে সাহায্যের প্রতিদান ফিরিয়ে দেওয়ার 'সেন্টিমেন্ট'ও রয়েছে। ফলে ভোটের সময় যা হওয়ার তাই-ই হয়!

0
133
durga pujo 2022

সুমন বটব্যাল, কলকাতা: ব্যাঙ্কের ডিভিডেন্ড হয়৷ শেয়ার মার্কেটেরও৷ কিন্তু তা বলে পুজোর অনুদানেরও (durga puja 2022) ডিভিডেন্ড! এটা কেমন বিষয়! জানতে হলে আপনাকে যেতে হবে কলকাতার ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জী স্ট্রিটে।

কথা হচ্ছিল বর্ধমানের এক পুজো উদ্যোক্তার সঙ্গে৷ বামপন্থী ঘরানায় বেড়ে ওঠা ওই পুজো উদ্যোক্তা অকপটে বলছেন, ‘‘কোনও রসিকতা নয়৷ মানুষের পালস্ বুঝতে হলে শিখতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে৷’’ আত্ম-সমালোচনার সুরে ওই পুজো উদ্যোক্তার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘ধর্মে নেই উৎসবে আছি৷ বামপন্থীদের এমন কিছু গোঁড়া মানসিকতার ১৬ আনা ‘সুফল’ ঘরে তুলছেন নেত্রী ৷’’

- Advertisement -

সত্যি কি তাই? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পুজোর অনুদান বনাম সরকারি কর্মচারিদের বকেয়া মহার্ঘ্যভাতা নিয়ে অনেক গা গরম করা চর্চ্চা হবে৷ বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়াতে পারে৷ এমনটা ‘অজানা’ ছিল না দক্ষ রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ তবু করলেন, কারণ বিগত ১১ বছর ধরে এই ডিভিডেন্ডের ১৬ আনা ‘ফসল’ ঘরে তুলেছেন তিনি!

ওই মহলের মতে, পালা বদলের বাংলায় সেই অর্থে তৃণমূলের সংগঠন ছিল না৷ মানুষ সিপিএমকে হঠালেও জেলায় জেলায় সিপিএমের সংগঠন (ক্যাডার) তখনও মজবুত ছিল৷ মানুষের ‘আবেগ’কে সেদিন কাজে লাগিয়ে সংগঠনকে বৃদ্ধি করার দিকে নজর দিয়েছিলেন নেত্রী৷ জেলায় জেলায় চালু করেছিলেন পুজোর অনুদান৷ কলকাতায় দুর্গা পুজো কার্নিভাল৷ এর সুফল অনেকটা সেই সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী, রূপোশ্রী কিংবা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো রাজ্যের ‘জনকল্যাণমূলক’ প্রকল্পের সমান! ‘শোবো, কিন্তু কেউ যেন জানতে না পারে’ টাইপের টিপিক্যাল বাঙালি কালচার! একান্তে সরকারের সুফল গ্রহণ করব। কিন্ত প্রতিবেশী যেন না জানতে পারে! ভাবখানা এমন, সাত কিংবা পাঁচ, কোনওটাতেই নেই। এদিকে সাহায্যের প্রতিদান ফিরিয়ে দেওয়ার ‘সেন্টিমেন্ট’ও রয়েছে। ফলে ভোটের সময় যা হওয়ার তাই-ই হয়!

দলের প্রথমসারির এক নেতার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘তৃণমূলের সবাই ভাল না৷ এটা জানতে বিশেষ বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই৷ আর পাঁচটা দলের তুলনায় এই দলে চোর, ছ্যাঁচড়ের সংখ্যা বেশি না কম, তা নিয়ে ইদানিং চর্চ্চা শুরু হয়েছে৷ কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জনমোহিনী’ প্রকল্পের মতোই এই পুজোর অনুদান বছর বছর আমাদের সাহায্য করে আসছে! কারণ, মানুষ হাতে কলমে উপকার পেতে চায়৷ সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার করে দেখিয়েছে৷’’

কেমন সেই সাহায্য? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমত: যে ৪৩ হাজার ক্লাবকে সরকার অনুদান দিচ্ছে তার অধিকাংশই জেলার৷ এবং এদের অধিকাংশেরই বাজেট লাখ দেড়েকের মধ্যে৷ সেখানে ৬০ হাজার মানে পুজোর সিংহভাগ খরচ চলে আসা৷ অন্যদিকে, রাজ্যের মহিলা মহলে দিদি-প্রীতির মূলে যে কটি কারণ রয়েছে তার অন্যতম বারোয়ারি পুজোর সঙ্গে সরকারকে যুক্ত করার এই অনুদান কৌশল৷ সরকারি এই অনুদানের দৌলতে রাজ্যের অধিকাংশ জায়গার পুজোতে আর চাঁদার জুলুমবাজি নেই৷ আবার যারা অনুদান পাচ্ছেন, সেই সব ক্লাবই যে তৃণমূলপন্থী এমনও নয়৷ কিন্তু তাঁরা অন্তত তৃণমূল সরকারের কাছ থেকে পুজোর অনুদানে টাকা নিয়ে ১৫ আগস্টের দিন ক্লাবে দেশের পতাকা উত্তোলনে অন্য দলের নেতাকে ডাকার ‘সাহস’ দেখাবেন না!

নিন্দুকেরা গলার শিরা ফুলিয়ে বলতেই পারেন, ‘পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি দিয়ে মানুষকে বশ বানানোর সরকারি প্রয়াস৷’ কিন্তু এই ‘পাইয়ে দেওয়ার’ রাজনীতিই যে সারদা, নারদ কাণ্ডের পরও উত্তরোত্তর তৃণমূলের ভোট বৃদ্ধি ঘটিয়েছে এটা অস্বীকার করছেন না অতি বড় মমতা বিরোধীও৷ বছর ঘুরলেই আবার একটা ভোট৷ এবারের ভোট গ্রামের৷ স্বভাবতই, দুর্নীতি ইস্যুতে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অনুব্রত মণ্ডলরা জেলে যাওয়ার ঘটনার পর শাসকের সম্পর্কে একাংশ মানুষের মধ্যে বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে৷ তার কতখানি এই অনুদান ঘোচাতে পারবে, আদৌ পারবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে৷ কিন্তু, সারদা, নারদ কাণ্ড পরবর্তী বাংলা বলছে, ‘অনুদানে’র (durga puja 2022) এই ডিভিডেন্ডই বারে বারে তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে দিদিমনির ভোট ব্যাঙ্কে৷ এবারেও তার পুনরাবৃত্তি হবে কি না, সময়েই মিলবে সদুত্তর৷

আরও পড়ুন: দিদির জমানা: ‘উনি চিলি চিকেন খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মুরগি মারার বিরোধী’

আরও পড়ুন: দিদির জমানা : ‘নতুন তৃণমূল’ কি কেবলই বিজ্ঞাপন  

downloads: https://play.google.com/store/apps/details?id=app.aartsspl.khaskhobor