দিদির জমানা : এক দশকে পুজোর উপকরণে যুক্ত হয়েছে ‘অনুপ্রেরণা’

0
47
Mamata Banerjee

খাস খবর ডেস্ক : ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে……’ বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে এই লাইনগুলি শুনলেই আগে মনে হতো পুজো শুরু হয়ে গেল, কিন্তু ২০২২ সালের বাংলায় পুজো কবে শুরু সেই ক্ষেত্রেও দরকার পড়ছে ‘অনুপ্রেরণার’, এমনটাই বলছেন অনেক সমালোচক। অনেকে তো কটাক্ষ করে এও বলেছেন, মা দুর্গাও বঙ্গে আসে সরকারের অনুমতি নিয়ে, কারণ পুজো কবে শুরু হবে, তা বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা দেখে নয়, ঠিক হয় সরকারের মতে, যেমন চলতি বছরে (Didir Jamana) ১ সেপ্টেম্বর থেকেই পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে। 

আরও পড়ুন : দিদির জমানা : ‘নতুন তৃণমূল’ কি কেবলই বিজ্ঞাপন  

- Advertisement -

‘অনুপ্রেরণা’ এমন একটি শব্দ যা গত এক দশকে (Didir Jamana) বহুল ব্যবহারে গুরুত্ব হারিয়েছে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর বাংলার দুর্গাপুজোর প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে রাজনীতিকরণ হয়েছে। এমন নয় যে ২০১১ সালের আগে পুজোর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারা যুক্ত থাকতেন না। কলকাতার বহু পুজো বাম আমলেও কংগ্রেস নেতাদের পরবর্তী ক্ষেত্রে তৃণমূল নেতাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যেমন প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাবের নাম সম্পৃক্ত ছিল বা ফিরহাদ হাকিমের চেতলা অগ্রণী, অরূপ বিশ্বাসের সুরুচি সঙ্ঘের, প্রদীপ ঘোষের লেবুতলা পার্ক (সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার) নাম ভরা বাম জমানাতেও সমাদৃত ছিল। এর অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন পুজো নিয়ে তৎকালীন শাসক বামেদের আদর্শগত অবস্থান। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় স্তরে বাম নেতারা পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকতেন তবে সরাসরি নয়। 

আরও পড়ুন : দিদির জমানা : বাংলায় বনধের সংস্কৃতি তো আজ অতীত, শিল্প ক’টা এল

২০১১ সালের পর কার্যত বাংলার কম বেশি সব পুজো কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে গেলেন শাসক দলের কোনও না কোনও নেতা, হয়তো তাদের নিজেদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতাও আছে দলের অভ্যন্তরে, যে কে কতগুলি পুজো কমিটির চেয়ারম্যান বা সভাপতি! বাংলার ক্লাবগুলি যে স্থানীয় স্তরে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে তা বেশ ভালই বোঝেন ছোট থেকে কালীঘাট সঙ্ঘশ্রীর পুজো দর্শন করা অধুনা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই ক্লাবগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্রীড়া ক্ষেত্রের উন্নতির জন্য অনুদান দেওয়া শুরু করলেন, এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিরোধীরা সমালোচনা করলেন, নিন্দুকেরা কটাক্ষ করলেন, তাতে কার কি? বরং “তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই”, এখানে সোনার হরিণ হল ভোট, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।

আরও পড়ুন : দিদির জমানা: ‘নয়া তৃণমূলে’র স্লোগান মনে পড়াচ্ছে উন্নততর বামফ্রন্টকে

এরপর ক্লাবে অনুদান প্রসঙ্গ। অর্থাৎ এমন একটি ব্যবস্থা করা, যার ফলে পুজোতেও ‘অনুপ্রেরণার’ ছোঁয়া রাখা যায়। কেউ কেউ তো এমনও বলছেন, এক একটি প্যান্ডেলে প্রতিমা দর্শনে যাবেন, কোথাও দেখবেন থিমের প্রতিমা, আবার কোথাও সাবেকী প্রতিমা, কোথাও ডাকের সাজ, কোথাও ভেনাস মূর্তি, কিন্তু সর্বত্র একটি বিষয় এক, তা হল মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। প্যান্ডেলের বাইরে কোথাও না কোথাও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এহেন পোস্টারের দেখা মিলবেই, দাবি করলেন কলকাতায় প্যান্ডেল হপিং করা এক ব্যক্তি। বিরোধীরা অবশ্য বলেন, আসলে তৃণমূল এমন একটা ব্যাপার তুলে ধরতে চায়, যে তারা আছে বলেই যেন দুর্গাপুজো হচ্ছে! ২০১১ সালের আগে বাংলাতে মনে হয় দুর্গাপুজোই হতো না! 

আরও পড়ুন : দিদির জমানা: ‘উনি চিলি চিকেন খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মুরগি মারার বিরোধী’

আসলে এর কারণ অনেক গভীরে, বাঙালি সমাজ সম্পর্কে অধ্যাপক ডঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, বাঙালি সমাজ হল রাজনৈতিক সমাজ। ফলে অধ্যাপক চট্টোপাধ্যায়ের কথা অনুযায়ী যদি এই সমাজটি একটি রাজনৈতিক সমাজ হয়, তাহলে সেই সমাজের অন্যতম বড় উৎসবের রাজনীতিকরণ হওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। বেশ কিছু পুজো কমিটির থিম নির্বাচন যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত, তাও দেখা গিয়েছে গত কয়েক বছরে, যেমন যাদবপুরের কেন্দুয়া শান্তি সঙ্ঘের ২০১৬ সালের থিম ছিল লালে বিপদ, সবুজেই শান্তি, পাটুলী সেন্ট্রাল ক্লাবের ২০১৮ সালের থিম ছিল রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে, যে বক্তব্যের প্রভাবে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাংলায় রক্তের হোলি খেলা হয়েছিল, তা নিয়ে পুজোর থিম যে কেবল নান্দনিক কারণে হয় না তা একটি চার বছরের শিশুও বোঝে। 

পুজো কমিটির নিয়ন্ত্রণ রাখা যা কত গুরুত্বপূর্ণ বর্তমানের পরিচয়সত্ত্বা ভিত্তিক রাজনীতির অঙ্গনে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়। তমলুকের একটি ক্লাবে নাকি ভোটাভুটি হবে যে তাদের পুজোর উদ্বোধনে সৌমেন মহাপাত্র আসবেন নাকি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ভাল ফলাফল করার পর বেশ কিছু পুজো কমিটির নিয়ন্ত্রণ বিজেপি নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, এমনকি কোথাও কোথাও উদ্বোধনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন নাকি মুখ্যমন্ত্রী, তা নিয়েও পাড়ার চায়ের দোকানে বাজি ধরা হয়েছিল। তবেই বুঝুন, মা দুর্গাও বোধ হয় ভাবছেন মর্ত্যে একি অবস্থা, শেষে কিনা ঘরের মেয়েকে নিয়েও রাজনীতি! এই পোড়া দেশে একমাত্র রাজনীতিটাই দারুণ ভাবে হয়, ভোটেও সাফল্য মেলে। তবে চিরদিন কি মিলবে, উত্তর দেবে সময়।