দিদির জমানা : বাংলায় বনধের সংস্কৃতি তো আজ অতীত, শিল্প ক’টা এল

বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসন এগারো বছর পূর্ণ বারো বছরে পদার্পণ করেছে গত মে মাসে। এই প্রতিবেদনের মধ্যে সন্ধান করা হয়েছে বাংলায় গত এক যুগে শিল্পে বিনিয়োগের হাল হকিকতের। অনেক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলেছে এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে।

0
131
didir jamana

রূপক চট্টোপাধ্যায়: ইতিহাস প্রশ্ন করে, ইতিহাস উত্তর চায়। সমস্ত শাসকের বিচার হয় ইতিহাসের দেওয়ালে। বাংলা এই মুহূর্তে তৃণমূল শাসনের (didir jamana) এক যুগ পূর্ণতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। তাই এবার ইতিহাসের কাছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কিছু উত্তর তো দিতেই হবে বাংলার বিধানসভায় ২১৩ আসন পাওয়া প্রবল পরাক্রমশালী শাসককে। শাসকের পদে বসলে যেমন অনেক ক্ষমতা ভোগ করা যায়, সেলাম পাওয়া যায়, লালবাতি গাড়িতে চাপা যায়, তেমনই কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, যা নিয়ে নিজেরা একসময় চাপে ফেলতেন অতীতের শাসককে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের (didir jamana) ভাল দিক বলতে বললে অনেকেই একটি কথা বলেন, বাংলার কর্মনাশা বনধের সংস্কৃতি বন্ধ করেছেন একসময়ের লাগাতার বনধ ডাকা বিরোধী নেত্রী অধুনা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক, তা তো বোঝা গেল। কিন্তু এরফলে বাংলার শিল্প সম্ভাবনার ভাগ্য কি কিছু বদলাল? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, ইতিহাস এই উত্তর খুঁজতে শুরু করেছে। প্রতিবছর নিয়ম করে বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন হয়, সেখানে অনেক মউ স্বাক্ষর হয়, ঠিক যেমন বাম আমলে জ্যোতি বসু বিদেশ সফরে গেলে অনেক মউ স্বাক্ষর হতো, কিন্তু এই ক্ষেত্রে একসারিতে বসে গিয়েছেন জ্যোতি-মমতা। দুই ক্ষেত্রেই নাকি মউ স্বাক্ষর হয়, কিন্তু এর থেকে মধু আসে না, অর্থাৎ শিল্প আসে না। ২০২২ সালের বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে ৩ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু বাস্তবে দিনের আলো দেখেছে কয়টি প্রস্তাব? উত্তর জানতে বাঙালির কাছে অধুনা সিধুজ্যাঠার ভূমিকা নেওয়া সবজান্তা গুগল মামাকে ডাকখোঁজ করেও লাভ নেই।

- Advertisement -

আরও পড়ুন : দিদির জমানা: ‘উনি চিলি চিকেন খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মুরগি মারার বিরোধী’

বরং বাংলা থেকে শিল্প ক্রমশ মুখ ফেরাচ্ছে, তা বেশ কিছু তথ্যে ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠছে। যেমন কেউ কেউ সামনে আনছেন ‘স্টেট অফ এনভায়রনমেন্ট রিপোর্ট, ২০২১’ সেখানে বলা হয়েছে, বাংলায় শিল্পকেন্দ্রের সংখ্যা ২০১৬ সালের ৬০,৯০০ থেকে কমে এখন হয়েছে ৩৯,৩৫৯। বড় শিল্প ১৩৩৭ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০৬৬। কারখানা বন্ধ হওয়া ও কর্মচারীদের কর্মচ্যুত হওয়ার মানে যে বিপুল পরিমাণ শ্রম দিবস নষ্ট তা বুঝতে বড় অর্থনীতিবিদ হতে হয় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরেই বনধ ব্যর্থ করতে উদ্যোগী হলেন। তৃণমূল শাসনের প্রথম বনধ ছিল ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, শহরে প্রবল অশান্তি হল। এমনকি যাদবপুরের গাঙ্গুলিবাগানে তৃণমূল কর্মীরা ধর্মঘটীদের পেটাচ্ছে সেই ছবি তুলতে গিয়ে আক্রান্ত হল সংবাদমাধ্যম, সেই প্রথম তৃণমূল শাসনে সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত পড়ল। বনধ করলে পরে দোকান খুলতে দেওয়া হবে না ব্যবসায়ীরা এমন হুমকির মুখেও পড়লেন। ভারতের মতো স্বাধীন দেশে কাউকে যেমন জোর করে ধর্মঘট করতে বাধ্য করা অন্যায়, তেমন কেউ ধর্মঘট করতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়াও সমান অন্যায়। পুলিশ নামিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু দলীয় কর্মীদের নামিয়ে গায়ের জোরে বনধ ভাঙার প্রয়াস যে আইনশৃঙ্খলারই অবনতি করেছে, তা আড়ালে অনেক পুলিশকর্তাই মেনে নেন। ফলে বনধ ব্যর্থ হলেও বনধকে কেন্দ্র করে অশান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ধর্মঘটের দিনে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়েছেন সিপিএম ও তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা 

সরকারী অফিসগুলি বনধের দিনে পরিণত হয়েছে পিকনিক স্পটে। এমনই তো দেখা গিয়েছে মহাকরণের কর্মীরা সকাল বেলায় বাবুঘাটে ডুব দিয়ে বনধের দিন অফিসে এসে কাজে ডুব থুরি ঘুমে ডুব দিয়েছেন। এর বদলে জামাইষষ্ঠী, ছট পুজোতে ছুটি কর্মসংস্কৃতির পরিচয় দেয় বৈকি! এমনকি অনেকে তো বলছেন ২১ জুলাই সরকারী অফিসগুলিতে ঢু মারলে মনে হবে বামফ্রন্ট আমলে ফিরে গিয়েছেন, মনে হবে কোনও বনধের দিন অফিসে গিয়েছেন। তাই শিল্পপতিরা শুধুমাত্র বনধ ব্যর্থ হয় এই জেনে বিনিয়োগ করতে আসেন না, বরং নজর দেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, তোলাবাজির মতো বিষয়গুলিকে। নব্বইয়ের দশকের থেকে জ্যোতি বসু বুঝেছিলেন আর আগ্রাসী ট্রেড ইউনয়ন আন্দোলন নয়, রাজ্য শিল্প আনতে হবে। শিল্পোন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে। তবে ২০০১ সালে পাম এভিনিউ নিবাসী এক বঙ্গজ কমিউনিস্ট বাংলার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলার যুবসমাজের মন পড়তে পেরেছিলেন, বুঝেছিলেন এই বাংলা মায়ের দেশে বেকারের মায়ের চোখের জল যাতে আর না ঝরে তার জন্য তাঁকেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে একবার তো বনধের বিরোধিতায় সাংবাদিক সম্মেলনে মন্তব্য করে অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন আলিমুদ্দিন স্ট্রীটকে। এরপর টাটা প্রসঙ্গ সকলেরই জানা। এক দুর্গাপুজোর সকালেই দেবী বিসর্জনের আগে বাঙালির শিল্প সম্ভাবনার বিসর্জন ঘটেছিল, বাংলা থেকে বিদায় নিয়েছিল টাটা।

https://play.google.com/store/apps/details?id=app.aartsspl.khaskhobor

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একসময় যে রাজ্য থেকে টাটাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই রাজ্যে বিনিয়োগ করতে গেলে অন্তত দশবার ভাববেন শিল্পপতিরা। সিঙ্গুরের টাটার কারখানার জমিতে সর্ষে চাষের ছবিটাই বাংলার শিল্প সম্ভাবনার প্রকৃত চিত্র। বর্তমানে শাসক দলের কেষ্ট-বিষ্টুদের চালকল থেকে যখন গাড়ি বেরোচ্ছে, তখন অনেকেই মজা করে লিখছেন সামজিক মাধ্যমে “চালকলে গাড়ি থাকে, আর গাড়ি কারখানার জমিতে সর্ষে চাষ, ধান চাষ হয়!” অধুনা নয়ডা, ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাই নিবাসী কাজের সন্ধানে যাওয়া বাঙালি যুবকরা মনে করেন, সিঙ্গুরের কারখানা যখন ডিনামাইট দিয়ে ভাঙা হচ্ছিল, আসলে ওটায় কারখানার দেওয়াল ভাঙছিলনা, ভাঙছিল বাংলার কোটি কোটি বেকারের হৃদয়, বুকের পাঁজর। তাই প্রশ্ন তো উঠবেই, বনধ তো বন্ধ, শিল্প কত এল? উত্তর কি আছে?

                                                                            (চলবে…)