সুপ্রিম কোর্টের সিলমোহর সেই তিমিরেই

0
41
Yogendra Yadav

যোগেন্দ্র যাদব : সকালবেলা। জোরে জোরে দরজায় বেল বাজছে। আপনি দরজা খুললেন। খুলেই কিছু অফিসারদের দেখতে পেলেন: “আমরা ইডি। আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাদের সাথে যেতে হবে। এক্ষুণি।” আপনি তাদের সাথে তাদের অফিসে পৌঁছলেন। আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়: “আপনি কি গত বছর আপনার একটা প্লট গুপ্তজিকে বিক্রি করেছিলেন?” আপনি বললেন: “হ্যাঁ, আমার নিজস্ব প্লট ছিল, কোনো বিতর্কিত সম্পত্তি ছিল না। দু নম্বরি করে বিক্রি করিনি, কোনো কালো মামলাও নেই। সঠিক পন্থায় নথিভুক্ত, সাক্ষী, সমস্ত প্রমাণও আছে আমার কছে।”

তারা আপনার প্রমাণের প্রতি একটুও আগ্রহী নয়: “আপনি কি জানেন যে গুপ্তা, যার কাছে আপনি প্লট বিক্রি করেছেন, ব্যবসায় কারচুপি করার জন্য তার বিরুদ্ধে ৪২০ র মামলা আছে?” আপনি মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন: “দেখো ভাই, আমি তার কাছে প্লট বিক্রি করেছি, কন্যাদান করিনি। সম্পত্তির এজেন্ট চুক্তিটা করেছে। পেমেন্ট চেকের মাধ্যমে এসেছে। তার সাথে, তার পরিবার বা ব্যবসার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। মাস কয়েক আগে আমি খবরের কাগজে পড়লাম যে তার বিরুদ্ধে কিছু ফর্ম রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। কিন্তু সেসব তো আমাদের চুক্তির পরে ঘটেছে।” আপনি মনে করলেন,যে ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়েছে। বিষয়টা মিটে গেছে।

- Advertisement -

কিন্তু তখনই আপনার মাথায় পাহাড় ভেঙে পড়বে: “মনে হচ্ছে আপনি PMLA (প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট) আইনটার ব্যাপারে কিছু জানেন না। আপনি এই আইনের অধীনে একজন অপরাধী। কারণ অপরাধের আয় আপনার পকেটে পৌঁছেছে। কাজেই আপনিও একজন অপরাধী। এই অপরাধের দরুন আমরা আপনাকে গ্রেফতার করছি!” এইবার আপনার মনে পড়ল যে গত মাসে আপনার স্থানীয় এসডিএমের সাথে আপনার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তিনি তখন আপনাকে হুমকি দিয়েছিলেন ” তোকে জেলে পিষে মারব!”

তারপরও আপনি নার্ভাস হয়ে পড়েননি: “যদি গ্রেফতারই করতে চান, তাহলে এফআইআর দিন আমায়”। ইডি অফিসার তাচ্ছিল্য ভরে হাসলেন: “আমাদের এখানে এফআইআর হয় না। এটা থানা নয়। আমাদের কাছে ECIR নামে একটা প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরী হয়।” হঠাৎ আপনি বলে উঠলেন: “আচ্ছা ভাই, ঠিক আছে। কিন্তু, সে নাম যাই হোক না কেন, আমাকে এর একটা কপি তো দিন অন্তত।” তিনি আবারও সেই একইরকম ভাবে হাসলেন: “না, ইসিআইআর একটা গোপন নথি। এটা অপরাধীকে দেওয়া যায় না। আর হ্যাঁ, এটাও শুনুন। আপনার বিচার সিআরপিসির কথায় হবে না। আমাদের নিজস্ব নিয়ম আছে। আর সেটাও, গুপ্ত!” আপনি অবাক হয়েছেন: “ভাই, যে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়, তাকেও এফআইআর দেওয়া হয়। কোর্ট মার্শালের নিয়মও দেওয়া হয়। আর একটা কথা। আমি একজন অভিযুক্ত, এখনও অপরাধী নই।” তিনি বাঁকা হাসি হাসছেন: “প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট অনুসারে, ইডি আপনাকে সন্দেহ করেছে, তাইই আপনি এখন একজন অপরাধী। এখন আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি নির্দোষ।” ক্লান্ত হয়ে আপনি বললেন: “ভাই, আমি সেই প্লটটা বিক্রি করে ভুল করেছি। আমি সমস্ত টাকা ফেরত দিয়ে দেব। আমার প্লটটা ফিরিয়ে দিন শুধু।” কিন্তু হায়! অনেক দেরি হয়ে গেলো যে। এখন সরকার প্লটটা সংযুক্ত করেছে, মানে আপনি সেটি বিক্রিও করতে পারবেন না বা কিনতেও পারবেন না। অথচ এখন তা আপনার অপরাধে পরিণত হয়েছে।

ভালো ফাঁদে পড়া গেলো দেখছি! পরের দিন আপনার উকিল এসেছেন। আপনি তাঁকে জামিনের আবেদন করতে বলেন। তিনি বললেন: “বাবুজী, এই মামলায় জামিন অসম্ভব মনে করুন। অর্থাৎ, আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে এবং আপনি ভবিষ্যতে এমন অপরাধ আর করবেন না বলে আদালত সন্তুষ্ট হলেই জামিন পাওয়া যাবে।” আপনি বিরক্ত হয়ে চিল্লে উঠলেন: “আমার অপরাধ কী, আমি সেটা পর্যন্ত জানি না। আমি কীভাবে প্রমাণ করব যে আমি নির্দোষ? যাকগে। কিন্তু, এই ধরনের দুর্ঘটনা যে আর কারও সঙ্গে ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?’ আইনজীবী মাথা নিচু করে বলেন, ‘সেজন্যই তো বলেছিলাম এই মামলায় জামিন পাওয়া অসম্ভব।”

জেলে অনেক কটা মাস কেটে গেছে। আপনি ভেঙে পড়েছেন। ব্যবসায় লোকসানও শুরু হয়েছে। প্রতিবেশীদের কানাকানি আর রাস্তাঘাটে অনবরত চলতে থাকা কটূক্তি শুনে আপনার পরিবারের সদস্য ও বাচ্চারা বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু একটা কথাই বারবার আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে: “আমি তো কিছুই করিনি। আমি তো শুধু একটা প্লট বিক্রি করেছি। কোনো রকম চুরি করিনি, কারচুপি করিনি। কেউ দয়া করে আমায় বলবেন, আমার অপরাধটা ঠিক কি?” আইনজীবী বলেন: “বাবুজী, প্রশ্নটা তো সত্য বা মিথ্যার নয়। আইনের।” আপনার শুভাকাঙ্খিরা আপনাকে সান্ত্বনা দেন: “জলে থাকার সময় কখনো কুমিরের সাথে ঝগড়া করতে নেই। কী দরকার ছিল একজন স্থানীয় আইএএস অফিসারের সাথে তালগোল পাকানোর? সন্ত্রাসবাদের অর্থায়ন বন্ধ করার জন্য এই আইন করা হয়েছিল, কিন্তু গত কয়েক বছরে এই আইন রাজনৈতিক বিরোধীদের প্যাঁচে ফেলার জন্য ব্যাবহার করা হয়েছে। আগে প্রতি বছর গড়ে ১০০ থেকে ২০০ মামলা হতো, কিন্তু গত তিন বছরে ৫৬২ টা মামলা, তারপর ৯৮১ ও ১১৮০ টা মামলা হয়েছে এই আইনে। ছোলার সাথে সাথে তোমার মতো একটা ঘুন পোকাও পিষে গেল।” আপনার করুণ মুখ দেখে আপনার উকিল বললেন: “এক্ষুনি এটা ধরে নেবেন না যে আপনার শাস্তি হবে। শুনানি শুরু হলে বিচারকের সামনে আমি আপনার সত্য তুলে ধরব। আমি নিশ্চিত আপনি নির্দোষ এবং আপনি মুক্তি পাবেন। এখনও পর্যন্ত এই আইনে ৫৪০০ টা মামলা হয়েছে আর মাত্র ২৩ জনের শাস্তি হয়েছে।

“কিন্তু কবে? পাঁচ-দশ বছর জেলে থাকার পর? পুরো পরিবারের মুখে চুনকালি লাগানোর পরে? এই অসাংবিধানিক আইনটাকেই জ্বালিয়ে দেয়া দরকার।” আইনজীবীর মাথা নিচু হয়ে গেল। “বাবুজি, এই বিষয়টা সুপ্রিম কোর্ট অবধি গিয়ে ফিরে এসেছে। মনে হয় আপনি খবরের কাগজ পড়েন না। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে তার রায় দিয়েছে। অবসর নেওয়ার আগে বিচারপতি খানউইলকর তার চূড়ান্ত রায়ে এই আইনের সমস্ত ধারাগুলিকে গ্রহণ করেছেন। এখন এই আইন ন্যায়সঙ্গত। এখন এটাই ন্যায়বিচার।”

লেখক : যোগেন্দ্র যাদব, রাজনৈতিক দল স্বরাজ ইন্ডিয়ার সভাপতি