নাগাসাকি দিবস: একঝাঁক যুক্তি-তক্কো

0
41

বিশ্বদীপ ব্যানার্জি: ১৯৪৫ সালের ৯ অগাস্ট (Nagasaki Day)। মাত্র তিনদিন আগেই আধুনিক সভ্যতার অন্যতম মূর্ত প্রতীক হিরোশিমার নাম পৃথিবী থেকে মুছে দিয়ে জাপানের কোমর ভেঙে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরেও আশ মিটল না রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যানের।

আরও পড়ুন: রাশিয়াতে আটকাতে আমেরিকার কৌশল, এবারে কি NATO তে ভারত

- Advertisement -

এবারে লক্ষ্য হিরোশিমা থেকে কয়েক মাইল দূরে আরও এক সুসভ্য শহর। নাগাসাকি। শহরের বুকে আছড়ে পড়ল ভয়ঙ্কর পারমাণবিক বোমা। হিরোশিমায় প্রয়োগ করা হয়েছিল লিটল বয়। এবারে ফ্যাট ম্যান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ফ্যাট ম্যান নামক এই নিউক্লিয় বোমা বিস্ফোরণে নাগাসাকিতে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এঁদের সিংহভাগ-ই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যান বহু মানুষ।

কেটে গিয়েছে ৭৭ বছর। আজ ৯ অগাস্ট, ২০২২ (Nagasaki Day)। ৭৭ তম নাগাসাকি দিবস (Nagasaki Day)। তবু আজও নিরসন হল না এই তর্কের। অক্ষশক্তির পরাজয় প্রায় নিশ্চিত, এই অবস্থায় তবু কেন হিরোশিমা এবং নাগাসাকি ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার? ইতালি-জার্মানি আত্মসমর্পণ করলেও জাপান তখনও রণে ভঙ্গ দিতে চায়নি। তাই কি এই সিদ্ধান্ত?

যুক্তি দিতে চাইলে অনেক যুক্তি-ই দেওয়া যায়। তবে আমেরিকা যে কারণ দেখিয়েছিল, তা কোনওমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাদের দাবি ছিল, এই দুই বিস্ফোরণের কারণে জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ফলে বিশ্বযুদ্ধের-ও পরিসমাপ্তি ঘটে। যদি দুই বিস্ফোরণ না ঘটানো হত, সেক্ষেত্রে যুদ্ধ হয়ত আরও কয়েক মাস ধরে চলত। তাতে আরও বেশি প্রাণহানির সম্ভাবনা ছিল। সেখানে মাত্র দুটো শহর ধ্বংস হয়েছে।

সভ্যতার মধ্যে-ই লুক্কায়িত থাকে নৃশংস বর্বরতার বীজ। সময় বিশেষে তা ফুটে ওঠে তথাকথিত সভ্য মানুষের আচরণে কিংবা কথায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এহেন অজুহাতে সেই বর্বরতা-ই ফুটে বেরিয়ে এসেছিল। এই অজুহাত কখনওই কোনও সুসভ্য জাতিকে শোভা পায় না। যুদ্ধ থামাতে গিয়ে দুটি শান্ত শহরকে প্রায় ৪ লাখ মানুষসহ সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া! কোনও সভ্য মানুষে পারে এ কাজ করতে? বোধহয় অসভ্য-ও পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, দুটি শহর-ই চলমান বিশ্বযুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল।

কিন্তু এটি-ই প্রকৃত কারণ নয় বিস্ফোরণের। আসলে এটি কারণ-ই নয়। অজুহাত মাত্র। বিস্ফোরণের আসল ব্যখ্যা হল, আমেরিকার অহং। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াই দ্বীপে মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন পার্ল হারবারের ওপর সামরিক আঘাত হানে জাপানের বাহিনী। এই ঘটনা-ই আমেরিকাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশ নিতে বাধ্য করেছিল। এরপর যুদ্ধের জল যত গড়িয়েছে, ততই মজবুত হতে থেকেছে মার্কিনিদের অবস্থান। তবু পার্ল হারবারের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে থাকে তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা। হিরোশিমা এবং নাগাসাকি ছিল কার্যত পার্ল হারবারের-ই প্রতিশোধস্বরূপ।

আরও একটি ব্যখ্যা রয়েছে। তলিয়ে দেখলে তাকেও প্রকৃত কারণ বলা যায় বৈকি। তা হল, ক্ষমতার দম্ভ। পরমাণু শক্তি হাতে থাকলে তুমিই বিশ্বের অধিপতি, এ কথা ততদিনে সব দেশই জেনে গিয়েছে। আমেরিকার হাতে সে শক্তি ছিল। তারা তো নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করবেই। জাপানকে সে সময় থামানো প্রয়োজন। ফলতঃ তাদের ওপরই শক্তি প্রয়োগ করা হল। আসলে বিশ্বের প্রতিটি দেশকেই বার্তা দিয়ে রাখা— “দেখছ তো? আমার সঙ্গে লাগতে এসো না। আমি যেভাবে উঠতে বলব সেভাবে উঠবে, যেভাবে বসতে বলব সেভাবে বসবে। নাহলে….”

খাস খবর ফেসবুক পেজের লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/khaskhobor2020/

বিশ্বে আজ এই যে এত হানাহানি। ইউক্রেনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে রাশিয়া। চিন হুমকি দিচ্ছে তাইওয়ানকে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে একেকটি জঙ্গিগোষ্ঠী। অস্বীকার করার কোনও উপায় এই হিংসার বীজ প্রথম বপন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ই। ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ অগাস্ট। আজ আমেরিকা যতই সাধু সাজার চেষ্টা করুক। সত্যিটা তাতে কখনও মিথ্যা হয়ে যাবে না। ইতিহাসে চির কলঙ্কিত হয়ে থাকবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ তম রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান।