কোমরজলে নেমে করতে হয় সূর্যপুজো, জেনে নিন ছট পুজোর নেপথ্যের তাৎপর্য

"মার্কণ্ডেয় পুরাণ" মতে, সৃষ্টির দেবী নিজেকে ছ-ভাগে ভাগ করেছিলেন। ষষ্ঠটি মাতৃরূপ। একটি কাহিনী থেকে জানা যায়, প্রথম মনু প্রিয়বত সন্তানহীন হওয়ায় পিতা কাশ্যপের পরামর্শে 'পুত্রীয়েষ্টি যজ্ঞ' করালেন। এতে একটি ছেলে জন্মালো ঠিকই কিন্তু মৃত। তখন আকাশে এক দেবী আবির্ভূতা হয়ে বললেন, তাঁর নাম ষষ্ঠী, তিনিই সমস্ত শিশুকে রক্ষা করে থাকেন।

0
132

বিশ্বদীপ ব্যানার্জি: লাতিন আমেরিকার ‘ইনকা সভ্যতা’ একা মোটেই নয়। সূর্য উপাসনা এদেশেও সুপ্রাচীন। ঋগ্বৈদিক মতে, সূর্য ও তাঁর পত্নী ঊষা অন্যতম প্রধান দেবদেবী। আবার সূর্যকে মনে করা হয় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের উৎস। তাই জীবনের ধারা অব্যাহত রাখতেই চৈত্র এবং কার্তিক মাসের (মূল এটিই) শুক্লাষষ্ঠীতে ভোরবেলা জলাশয়ে নেমে সূর্যবন্দনা— তারপর নানারকম ফল, ঠেকুয়া, পায়েস ইত্যাদি নিবেদন সহকারে ‘সূর্য-ষষ্ঠী’ ব্রত পালন করেন মূলত উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ডের মানুষজন। এই ষষ্ঠী অপভ্রংশে ‘ছট্’ বা ‘ছঠ্’ হয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: যম-পুকুর ব্রত: গ্রামবাংলার এক লৌকিক পার্বণ

স্বাভাবিকভাবেই ‘ছটে’র সূত্রপাত নিয়ে নানান পৌরাণিক উপাখ্যানের উদ্ভব ঘটেছে। “রামায়ণ” অনুযায়ী, ১৪ বছরের বনবাস শেষে এই দিনই রাম অযোধ্যায় ফেরেন এবং কুলদেবতা সূর্যকে আরাধনা করেন। ওদিকে, “মহাভারতে”র আবার চারটি ভিন্ন বক্তব্য। (১) সূর্যের উপাসনা করে কুন্তীর কর্ণকে জন্ম দেওয়া থেকেই ছট্ ব্রতের সূচনা; (২) বনবাসকালে কুলপুরোহিত ধৌম্যের কথায় সূর্যের পূজা করে দ্রৌপদী ‘অক্ষয়পাত্র’ লাভ করেছিলেন; (৩) কর্ণ নদীতে কোমর পর্যন্ত নেমে সূর্যের উপাসনা করতেন, সে কারণে আজও ‘ছটে’ কোমর-জলে নেমেই সূর্যপুজো করতে হয়; এবং (৪) পান্ডু কিমিন্দম মুনিকে সঙ্গমরত অবস্থায় হত্যা করে শাপপ্রাপ্ত হয়েছিলেন যে সঙ্গমকালে তাঁরও মৃত্যু ঘটবে, তাই তিনি সন্তানলাভের আশায় স্ত্রী কুন্তীর সাথে সরস্বতী নদীর তীরে সূর্য বন্দনা করেছিলেন।

খাস খবরের মুখোমুখি দেবাশিস জানা৷ প্রাক্তন মেয়র ইন কাউন্সিল, বিধাননগর পৌর নিগম –

“মার্কণ্ডেয় পুরাণ” মতে, সৃষ্টির দেবী নিজেকে ছ-ভাগে ভাগ করেছিলেন। ষষ্ঠটি মাতৃরূপ। একটি কাহিনী থেকে জানা যায়, প্রথম মনু প্রিয়বত সন্তানহীন হওয়ায় পিতা কাশ্যপের পরামর্শে ‘পুত্রীয়েষ্টি যজ্ঞ’ করালেন। এতে একটি ছেলে জন্মালো ঠিকই কিন্তু মৃত। তখন আকাশে এক দেবী আবির্ভূতা হয়ে বললেন, তাঁর নাম ষষ্ঠী, তিনিই সমস্ত শিশুকে রক্ষা করে থাকেন। এই বলে তিনি মৃত পুত্রটিকে স্পর্শ করতেই সে বেঁচে ওঠে। ধারণা করা হয়, ইনিই সূর্য-ঘরণী ঊষা। মতান্তরে, ষষ্ঠী বা ছট্ সূর্যের স্ত্রী নন, ভগিনী। এবং পার্বতীপুত্র কার্তিকেয়র স্ত্রী, যাঁর অপর নাম দেবসেনা। তাঁকে তুষ্ট করতেই সূর্যকে আরাধনা করা হয়।

এছাড়া, বেদমাতা গায়েত্রীদেবীর জন্ম, মনে করা হয়, ষষ্ঠী এবং সপ্তমীর মধ্যবর্তী সময়ে। ইনিই ষষ্ঠীদেবী হতে সৃষ্ট সকল শিশুকে রক্ষার দায়িত্বে।

আরও পড়ুন: Durga Puja 2021: জগতে মাতৃত্বের প্রকাশ ঘটাতেই ষষ্ঠী রূপ নেন মহামায়া

দেখাই যাচ্ছে, নানা মুনির নানা মত। হ্যাঁ, ষষ্ঠী বা ছট্ সন্তান উৎপাদনের দেবী, ওদিকে সূর্যও জীবনের উৎস, এ সাদৃশ্যটা একটু চোখে লাগে ঠিকই। তা বলে বাকিগুলোও উপেক্ষা করার জো কোথায়? স্থান-কালের নিরিখে প্রতিটিই তো অকাট্য। ‘ছটে’র প্রত্যক্ষ উল্লেখ “অথর্ব বেদে”ও রয়েছে। ষষ্ঠী আসল দিন হলেও চতুর্থী থেকে সপ্তমী— টানা চারদিনই লবণবিহীন খাবার খেয়ে, এবং কখনও নিরম্বু উপবাস থেকে ব্রতটি করতে হয়।