‘এই মৃত্যু গর্বের’, ক্যাপ্টেন কণাদের মৃতদেহের সামনে বলেছিলেন বাবা

0
76

শান্তনু কর্মকার: বাবা আয়কর বিভাগে কর্মরত ছিলেন, মা গৃহবধূ। আগাগোড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে কণাদ ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা, খেলাধূলায় তুখোড় ছিলেন। সেন্ট জেমস স্কুলের ছাত্র কণাদ স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করেছিলেন জয়পুরিয়া কলেজ থেকে। ভালোবাসতেন ক্রিকেট খেলতে, কলকাতার ঘরোয়া ক্রিকেট লিগের প্রথম ডিভিসনেও খেলেছেন। ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্টও ছিলেন তিনি৷

সাধারণভাবে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে চাকরির দিকেই ঝুঁকতে বেশি পছন্দ করেন  বাঙালি যুবকরা। খুব বেশি হলে কেউ আবার শুরু করেন ব্যবসা। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন কণাদ। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার৷ সেনার অন্যতম পুরোনো ও ঐতিহ্যশালী ‘৮নং’ শিখ রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেনাবাহিনীর কাজে প্রচণ্ড নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন, কাজের চাপও নেহাৎ কম নয়। বছরে মাত্র একবার বাড়ি ফিরতে পারতেন তিনি। ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসেও তেমনই ছুটি নিয়েই বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। সেই কয়েকটা দিন বেশ ভালো কেটেছিল বাবা-মা, বোন, বন্ধুদের সঙ্গে। বন্ধুদের সঙ্গে বালিগঞ্জের এক রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়াও করেছিলেন তিনি। তারপর আবার ফিরে গিয়েছিলেন রেজিমেন্টে, কাশ্মীরে পোস্টিং হয়েছিল তাঁর। তখন আর কে জানত, সেটাই হবে তাঁর শেষ পোস্টিং!

আরও পড়ুন, ‘ছেলেকে পুলিশে দিন স্যার’ স্কুলের ফ্যান ভাঙায় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ অভিভাবকের

১৯৯৯ সালের মে মাসে ভারত জানতে পেরেছিল শীতকালে সেনাদের ছেড়ে আসা বাঙ্কার, ছাউনিগুলিতে দখল নিয়েছে পাক সেনা। যথেষ্ট প্রস্তুত হয়েই এসেছে তারা। পাক অধিকৃত কাশ্মীর থেকে লাইন অফ কন্ট্রোল অবধি তৈরি করে রেখেছে সাপ্লাই লাইন। মারাত্মক সব অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে এসেছে তারা। কৌশলগত দিক দিয়ে টাইগার হিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্গ ছিল পাকিস্তানের কাছে। গোটা কার্গিল এলাকার গতিবিধি বোঝা যেত ওই শৃঙ্গের ওপর থেকে। নিচ থেকে ভারতীয় সেনার কোনও দলকে এগোতে দেখলেই গুলি, গ্রেনেড ছুঁড়ছিল তারা।

সেনা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, একাধিক দিক থেকে টাইগার হিল অভিযান করবে তারা। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী-ই মোট আটজনের দল নিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন তরুণ লেফটেন্যান্ট কণাদ ভট্টাচার্য। তুষারাবৃত পাহাড়ের ওপর বৃষ্টিও হচ্ছিল তখন। সেইরকমই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অদ্ভুত দক্ষতায় এগিয়ে গিয়েছিলেন কণাদ। তবে পাক সেনার নজর এড়িয়ে চূড়ায় ওঠা সহজ কাজ নয়। কিছুক্ষণ বাদে পাক সেনা দেখতে পেয়ে যায় তাঁর দলের গতিবিধি। এরপরেই কণাদের পরাক্রমের সাক্ষী থাকে ভূস্বর্গ। কণাদের হাতের ইনসাস বজ্র হয়ে গর্জেছিল, অটো লোডিং রাইফেলের মুহুর্মুহু আক্রমণে লাশ পড়ছিল একের পর এক পাক সেনা, জঙ্গির। ধীরে ধীরে ভারতের জমি পুনর্দখল করছিলেন কণাদরা। তবে, বিধাতাই বুঝি সেদিন জয়তিলক এঁকে দিতে চাননি কণাদের কপালে। হঠাৎই ভাল হতে শুরু করেছিল আবহাওয়া। আশেপাশে অবস্থিত ইস্টার্ন স্পার, ওয়েস্টার্ন স্পার, ইন্ডিয়া গেট, রকি নব সহ একাধিক পাহাড় চুড়োয় ওঁৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি স্নাইপার কম্যান্ডোদের স্কোপ খুঁজে নিয়েছিল কণাদদের। তাও পিছিয়ে আসেননি কণাদ। যুদ্ধ করেছিলেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। তবে একসময় শান্ত হয়েছিল কণাদের ইনসাস। সাদা বরফে লুটিয়ে পড়েছিল রক্তে লাল হয়ে যাওয়া কণাদের দেহ, জলপাই রঙের উর্দি পরে চিরনিদ্রার দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে আরও প্রায় ২৫ দিন বাদে টাইগার হিল জয় করে ভারতীয় সেনা। ১৫ই জুলাই উদ্ধারকারী দল খুঁজে পেয়েছিল ঘুমন্ত কণাদকে। ১৭ই জুলাই কফিনবন্দী দেহ ফিরেছিল কলকাতায়৷ তেরঙ্গা জড়ানো দেহ মুড়ে ফেলা হয়েছিল তাজা ফুলে।

আরও পড়ুন,  চাইল্ড পর্নের রমরমা মহারাষ্ট্রে, দু’বছরে আপলোড ১৫ হাজারেরও বেশি ভিডিও

মৃত্যুর মাত্র মাত্র একদিন আগেই বাবা মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন কণাদ। ফোনে খোঁজ নিয়েছিলেন বোনেদের। কফিনবন্দী কণাদকে আঁকড়ে ধরেছিলেন মা পূর্ণিমাদেবী। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘তুই না বলেছিলিস, যুদ্ধ জিতে আমাকে মেডেল দিবি।’ কফিন ধরে আগত সবাইকে শান্ত থাকতে বলেছিলেন বাবা কমলাকান্ত। বলেছিলেন, ‘কাঁদবেন না কেউ, এই মৃত্যু গর্বের। ও দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে।’

সত্যিই তো এই মৃত্যু গর্বের। গর্বের বলেই নিজের ডায়রিতে ক্যাপ্টেন মনোজ পান্ডে লিখতে পারেন, ‘দেশের হয়ে লড়াইয়ে নিজেকে প্রমাণ করার আগে মৃত্যু এলে আমি মৃত্যুকে খুন করব।’ পয়েন্ট ৪৮৭৫ জয় করতে যাওয়ার আগে বাড়িতে ফোন করে বিক্রম বতরা বলতে পারেন, ‘হাঁ পাপা ম্যাঁয় জরুর আউঙ্গা। ইয়া তো হাত মে তিরঙ্গা ঝন্ডা লহরাতে হুয়ে, নেহি তো তিরঙ্গে মে লপটে হুয়ে। লেকিন মে আউঙ্গা জরুর৷’ ক্যাপ্টেন অনুজ নাইয়ার বাড়িতে ফোন করে বলতে পারেন, ‘মা মুঝে ফোন মত করনা’

আজ সেই কণাদ ভট্টাচার্য, মনোজ পান্ডে, অনুজ নাইয়ার,বিক্রম বতরাদের আরও একবার মনে করার দিন। আজ থেকে ২২ বছর আগে এই দিনেই প্রায় তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ফের তেরঙ্গা উড়েছিল কার্গিলে। আজ কার্গিল বিজয় দিবস।