রাবিশ নয়, Ravish.. নাম তো সুনা হি হোগা

0
110

শান্তনু কর্মকার: বিহারে একটা বেশ জনপ্রিয় প্রবচন রয়েছে, ‘বিহারের যুবকরা হয় ইউপিএসসি পাশ করে ফেলে, না হলে সটান গুণ্ডা হয়ে যায়’৷ প্রবচন থাকবে না-ই বা কেন? এখনও ভারতের সবচেয়ে কম সাক্ষরতার বিশিষ্ট রাজ্যটির নাম বিহার। সাম্প্রতিক অতীতে ছবিটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করলেও আমরা যারা ন’য়ের দশক কিংবা এই শতাব্দীর শুরুর দিকের খবর রেখেছি, তাদের অনেকের কাছেই বিহার মানে গুণ্ডারাজ, বিহার মানে অসামাজিক কার্যকলাপের ছড়াছড়ি। এমন এক বিহারের মোতিহারি জেলা থেকেই কিনা গল্প শুরু বর্তমান ভারতীয় টেলিভিশনের অন্যতম মুখের।

কথা হচ্ছে রভিশকে নিয়ে। কংগ্রেস হোক বা বিজেপি, চুনোপুঁটি মুখপাত্র হোক কিংবা রাশভারি নেতা.. রাত ন’টার প্রাইম টাইমে যাঁর চোখা চোখা প্রশ্ন কাউকে রেয়াত করে না, সেই রভিশ কুমারকে নিয়ে। ভদ্রলোক ইংরেজি বলায় বিশেষ স্বচ্ছন্দ্য নন, আপাতদৃষ্টিতে দাবড়ে চুপ করানোর মতো দাপুটে ব্যক্তিত্ব বলেও মনে হয় না, বরঞ্চ হিন্দির মধ্যে রয়েছে সাবলীল বিহারি টান। পরনেও বিশেষ অভিনবত্ব নেই, সাধারণ ব্লেজারের ওপর অতি সাধারণ টাই পরে ক্যামেরার সামনে আসেন। প্রথমবার ওঁকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখলে আপনারও মনে হতে পারে, এই লোকটা এই জায়গায় বড্ড বেমানান।

- Advertisement -

এরকম একাধিক ফ্যাক্টর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সত্ত্বেও কিনা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বাজিমাত করে যাচ্ছেন রভিশ। কীসের জোরে করছেন? প্রশ্ন করলে হয়ত এড়িয়ে যাবেন, কিংবা উত্তরে সবিনয়ে বলবেন, ‘আমি এখনও শিখছি, কাজ করে চলছি’ জাতীয় কিছু। তবে আমরা যারা ওঁর নিয়মিত দর্শক, তারা জানি.. অদ্ভুত এক সারল্য রয়েছে রভিশের সাংবাদিকতায়৷ টিভিতে খবর দেখার সময় আমার-আপনার যে প্রশ্নটা মাথাচাড়া দেয়, ঠিক সেই প্রশ্নটা সরাসরি তুলে ধরেন রভিশ। এমনিতেই সাংবাদিকতা অনেকটা পড়িয়ে দেয়, শিখিয়ে নেয়। সেই শিক্ষা তথা অভিজ্ঞতা মিশিয়েই রোজের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে সামনে আনেন রভিশ।

গোটাদেশে যখন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উদযাপন চলে, রভিশ কুমার প্রশ্ন করেন, ‘জনপ্রতি আয়’ নিয়ে। যখন সারা দেশে নোটবন্দির ফলে বিদেশের কালো টাকা ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখানো হয়, রভিশ প্রশ্ন করেন, ‘এই গোটা বিষয়টা আরও একটু গুছিয়ে নিয়ে করা যেত না? মানুষের ভোগান্তি তো কম হচ্ছে না’। দেশের তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিজেপি তাঁর শো বয়কট করেছে বহুদিন আগে, তাও রভিশ থামেননি, একইভাবে প্রশ্ন করে চলছেন বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, পরিকাঠামো সহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে৷

প্রশ্ন জাগতে পারে, চোস্ত ইংরেজি না বলতে পারা, দাপুটে ব্যক্তিত্ব না থাকা একটা মানুষ শুরু থেকেই এনডিটিভির মতো একটা চ্যানেলের শীর্ষে? উত্তরও বোধহয় খুব অজানা নয়, ক’বছর আগে একটি সাক্ষাৎকারে রভিশ নিজেই বলছিলেন, ‘ কর্মজীবনের শুরুর দিকে মনে হত যেন নাসার অফিসে চলে এসেছি। এত বড় বড় ক্যামেরা, টিভি, যন্ত্রপাতি আমি এর আগে কোনও দিন দেখিনি। তারপর ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়েছি, শুরুর দিন আর আজকের দিনের পার্থক্য এটাই যে, এখন মনে হয় এনডিটিভিতেই চাকরি করি।’

১৯৯৬তে সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর ডেস্ক সামলানো, রাস্তায় নেমে রিপোর্টিং থেকে শুরু করে হেন কাজ নেই যা রভিশ করেননি। আমরা তাঁকে দেখেছি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে, কখনও প্রবাসী বিহারি মজুরদের সঙ্গে এক থালায় খেয়েছেন, কখনও আবার রাজনৈতিক দলের জনসভাতে সেই দলেরই নীতি নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। হাওয়ায় ভেসে সফলতা আসেনি, হাজারো কারণ আছে, ‘রভিশ কি রিপোর্ট’, ‘প্রাইম টাইম’এর সাফল্যের পেছনে। ২০১৯ সালে র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরষ্কারও সংবাদমাধ্যমে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্যই।

দীর্ঘ ২৬ বছর এনডিটিভিতে কাটানোর পর আজ এনডিটিভি থেকে পদত্যাগ করলেন রভিশ। সকালেই খবর মিলেছিল, পরিচালন গোষ্ঠী থেকে ইস্তফা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়। আজ সন্ধ্যায় পদত্যাগ পত্র জমা দিলেন রভিশ কুমারও। নিন্দুকেরা তাঁকে ‘রাবিশ’ বলে হেয় করতেই পারেন, সংখ্যাগুরু দর্শক কিন্তু তাঁকে এক ডাকে চেনে। কী বলছেন? চেনেন না? আরে ধুর, হতেই পারে না, কখনও না কখনও আপনিও নিশ্চয়ই শুনেছেন, ‘নমষ্কার, ম্যাঁয় রাজা রভিশ কুমার’।