দিদির জমানা: ‘উনি চিলি চিকেন খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মুরগি মারার বিরোধী’

এক বর্ষীয়ান বাম নেতার কন্ঠেও শোনা যায় মমতার তারিফ, ‘‘রাজনীতিক মমতার বুদ্ধির কাছে অনেকেই নবীন৷ কারণ, জন্মাষ্ঠমীতে ফুল, জামাই ষষ্টীতে বাংলায় হাফ সরকারি ছুটি থাকে কি না সেই খবর রাখেন না শিল্পপতিরা৷ তাঁরা শুধু এটা খোঁজ নেন, যেখানে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছি, সেখানে বছরে ক’দিন বনধ হয়! মমতা এই কাজে ১০০ শতাংশ সফল৷’’

0
121
didir jamana

সুমন বটব্যাল, কলকাতা: বাংলায় শেষ কবে সর্বাত্মক বনধ হয়েছে? কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখুন৷ আপনা হতেই হাত ভায়া কপাল হয়ে মাথায় উঠে যাবে! ওঠাটাই স্বাভাবিক৷ কারণ, বসু-ভট্টাচার্যের আমলে উঠতে বসতে জলভাতে পরিণত হয়েছিল বাংলা বনধ। যার ‘ক্যাপ্টেন’ ছিলেন সেদিনের বিরোধী নেত্রী৷ পালাবদলের (Didir Jamana) বাংলায় সেই বনধকে খুঁজতে আতসকাচকেও বেগ পেতে হয়! এজন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোরতোর বিরোধীরাও ১৮ আনা ক্রেডিট দিয়ে থাকেন, গায়েত্রী কন্যাকে৷ কারণ, ২০১১ সালে বামেদের সমূলে উৎখাত করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করে দিয়েছেন, ক্ষেত্র বদলালে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়৷ তখতে বসে অনেক ঘোষণার ভিড়ে প্রধান যে ঘোষণাটা করেছিলেন, সেটা হল বনধের বিরোধিতা৷

একসময় নিজে বহু বনধ ডেকেছেন৷ অকপটে সেকথা স্বীকার করে নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, বনধ মানে শ্রম এবং অর্থ দুটোই নষ্ট৷ তাই বাংলার উন্নতিতে বনধকে কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না৷ বরং বনধ ব্যর্থ করতে সরকার তাঁর সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন৷ এমনকি বনধের দিনে সরকারি কর্মচারিরা অফিসে না এলে তাদের ছুটি কাটা যাওয়ার ঘোষণাও ‘খাতায় কলমে’ চালু হয় মমতারই আমলে৷

- Advertisement -

আরও পড়ুন : দিদির জমানা : বাংলায় বনধের সংস্কৃতি তো আজ অতীত, শিল্প ক’টা এল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিলেন আর রাজনীতি-আমুদে বাঙালি বনধের ঝাঁপ গুটিয়ে ফেললেন এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই৷ তাঁরা বলছেন, বনধ ব্যর্থ করতে মমতা অত্যন্ত সুচারুভাবে যেটি করেছেন সেটি হল- বনধের আগের দিন রাত্রেই সরকারি কর্মচারিদের অফিসে পৌঁছে যাওয়ার রেওয়াজ চালু করেছেন৷ যার ফলে ধর্মঘটের আগের দিন রাত্রে সরকারি অফিসগুলি কার্যত পিকনিকের আমেজে ধরা দেয়৷ এদিকে বনধের দিনে সেই অর্থে সরকারি অফিসে জন সমাগমও কম থাকে৷ ফলে মোটের ওপর খাতায় কলমে অফিস খোলা থাকলেও দিনভর ছুটির মেজাজেই কাটিয়ে বনধ ব্যর্থ করে বিকেল বিকেল বাড়ি ফিরে যান সরকারি কর্মীরা৷ শুধু তাই নয়, যে কর্ম সংস্কৃতি ধরে রাখতে এই বনধের বিরোধিতা, তার পুরষ্কার হিসেবে বাড়তি একটি ছুটির দিনও কিন্তু সুকৌশলে উপঢৌকন হিসেবে দেওয়া হয় সরকারি কর্মচারিদের৷

নিন্দুকেরা বলতেই পারেন, এ তো সেই ‘নকলি সাইনবোর্ড, পাবলিক ধোঁকা’! জামাইষষ্টী থেকে জন্মাষ্ঠমী, সবেতেই সরকারি ছুটি৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, মমতার এই দাবার চাল নিন্দুকদের মুখে ছাই দেওয়ার জন্য যথেষ্ট৷ কারণ, জ্যোতি-বুদ্ধর আমলে বাংলা যে’কটি কারণের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল, তার শীর্ষে ছিল এই বনধ নামক শব্দটি৷ সেই সময় বাংলায় শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী শিল্পপতিরাও শেষ মুহূর্তে যে প্রধান কারণে পিছু হঠতেন, সেটি হল বনধ৷ মমতার আমলে কত হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে৷ তবু একটা বিষয় স্পষ্ট- বিশ্বের দুয়ারে বাংলা একটা কালিমা থেকে মুক্ত হয়েছে৷ সেটি হল বাংলা মানেই বনধ নয়৷

বনধের দিনে অফিসে না এলে কামাইয়ের কথা ঘোষণা করে আদতে বনধের দিনেই সবচেয়ে বেশি হাজিরার রের্কডও গড়েছে বাংলা৷ যে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এক বর্ষীয়ান বাম নেতার কন্ঠেও শোনা যায় মমতার তারিফ, ‘‘রাজনীতিক মমতার বুদ্ধির কাছে অনেকেই নবীন৷ কারণ, জন্মাষ্ঠমীতে ফুল, জামাই ষষ্টীতে বাংলায় হাফ সরকারি ছুটি থাকে কি না সেই খবর রাখেন না শিল্পপতিরা৷ তাঁরা শুধু এটা খোঁজ নেন, যেখানে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছি, সেখানে বছরে ক’দিন বনধ হয়! মমতা এই কাজে ১০০ শতাংশ সফল৷’’

প্রশ্ন উঠতে পারে, আদতে বনধকে ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে সরকারি কর্মীদের ছুটির সংখ্যা বাড়িয়ে রাজ্যের কি উপকার হয়েছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলায় বনধ নিষিদ্ধ করে এক ঢিলে একাধিক দায় ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছেন দিদিমনি৷ তার অন্যতম প্রধান কারণটি হল, ২০০৬ সালে বাংলায় শিল্পস্থাপনে এগিয়ে আসা রতন টাটার গোষ্ঠী বাংলা থেকে ন্যানো কারখানা তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন সেদিনের বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক আন্দোলনের জেরে৷ ফলে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেও মমতার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শিল্প বিরোধী তকমা৷ সেই তকমা ঘোচাতে তাঁর রাজত্বে বাংলায় বনধ নিষিদ্ধ করে শিল্প মহলের সামনে অন্য বার্তা স্পষ্ট করাটা ছিল অত্যন্ত জরুরি৷ সেকাজে নেত্রী সফল- মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের৷

কারণ, ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে আদতে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে তৃণমূল৷ বাম আমলে প্রতিবাদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠা বনধ নামক ধারাল অস্ত্রটিকেই কার্যত ভোঁতা করে আদতে নেত্রী বাংলার কলকারখানা থেকে আক্ষরিক অর্থেই শ্রমিক সংগঠনের সেই প্রতিবাদী মনোভাবকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছেন৷ আগে বনধে কেউ রাস্তায় গাড়ি নামাতে ভয় পেতেন, এখন সেই ভয়ও উধাও৷ কারণ, তখতে বসে মমতার স্পষ্ট হুঙ্কার ছিল. বনধ ব্যর্থ করতে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করতে পিছপা হবেন না৷ সেই কারণে বনধের দিনে রাস্তায় দেখা যায় অতিরিক্ত সরকারি গাড়ি৷ লাগাতার সরকারিভাবে বনধ বিরোধিতার দৌলতে প্রায় এক যুগের রাজত্বে (Didir Jamana) বনধ বিষয়টায় বাংলা থেকে ফিকে হতে বসেছে৷ যার ফলে দেশজুড়ে বনধের দিনে নানা ঘটনা ঘটলেও বাংলায় শেষ কবে সর্বাত্মক বনধ পালিত হয়েছে তা মনে করতে বেগ পেতে হয় সন্ধ্যায় টেলিভিশনের সভায় বসা তথাকথিত তাত্ত্বিক বিদ্বজনদেরও৷ যদিও বাংলার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং মুখ্যমন্ত্রীর বনধের বিরোধিতা সম্পর্কে শিল্পমহলে একটি রসিকতা চালু হয়েছে- ‘উনি চিলি চিকেন খেতে ভালোবাসেন কিন্তু মুরগি মারার বিরোধী’!

downloads: 

https://play.google.com/store/apps/details?id=app.aartsspl.khaskhobor

                                                                                                       (চলবে…)