লকডাউনে কাজ খোয়ানো আত্মহননকারীকে মৃত্যুর চৌকাঠ থেকে ফিরিয়ে আনল কলকাতা পুলিশ

কে বলেছে সব পুলিশ অমানবিক! কলকাতা পুলিশের উর্দিধারীরা বুক ঠুকে বলতেই পারেন, ‘‘উর্দির আড়ালেও একটা সু-মন আছে, যে মন সবসময় মানুষের হয়েই কাজ করে৷’’

0
149

সুমন বটব্যাল, কলকাতা: ‘‘নমস্কার, কলকাতা পুলিশ৷ বলুন আপনার কি সাহায্যে লাগতে পারি৷’’
-সাহায্যের জন্য ফোন করিনি৷ ….আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি৷ আপনাদের হয়রানি কমাতেই সেটা জানিয়ে দিলাম!!!

সিনেমার ক্লিপিংসে দেখা এহেন কথোপকথন যে এভাবে তাঁকে শুনতে হবে, কল্পনাও করেননি কলকাতা পুলিশের কন্ট্রোল রুমের সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীটি৷ ফোনের ওপারের কান্না জড়ানো কথা শুনে পুলিশ কর্মীর মনের ক্যানভাসে ততক্ষণে ভেসে উঠেছে- টানা লক ডাউন, কাজ হারানোর যন্ত্রণা, হতাশার সাগরে তলিয়ে যাওয়া, আত্মহননের পথে এক সন্তানের বাবা…৷

- Advertisement -

বিচলিত হননি দুঁদে পুলিশ কর্মীটি৷ অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় কথা চালিয়ে গিয়েছেন ফোনের ওপারে থাকা সংশ্লিষ্ট আত্মহননকারীর সঙ্গে৷ জেনে নিয়েছেন ঠিকানা- ১৯ আলিপুর রোড৷ ইশরায় সহকর্মীকে ডেকে নোট নেওয়া কাগজের ওপর লিখে দিয়েছেন, ‘লক ডাউনে চাকরি খুইয়েছেন কয়েকমাস আগে৷ স্ত্রী এবং ১২ বছরের সন্তানকে প্রতিপালন করার ক্ষমতা নেই৷ আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও পথ নেই তাঁর কাছে৷ ফোনে সেকথা জানিয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন!’’

মঙ্গলবার৷ বেলা সাড়ে দশটা৷ কলকাতা পুলিশের কন্ট্রোল রুমে তখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা৷ পাশের রুম থেকে ফোন গেল আলিপুর থানায়৷ দ্রুত সংশ্লিষ্ট আত্মহননকারীর বাড়িতে পৌঁছালেন আলিপুর থানার সাব ইন্সপেক্টর মানস গোস্বামী৷ দরজা ঠেলতেই খুলে গেল৷ এক কামরার ঘরের কোনে দু’হাঁটুতে মাথা গুঁজে অঝোরে কেঁদে চলেছেন মাঝবয়সী ব্যক্তিটি৷

ভরসার হাত ছুঁল পিঠ৷ চোখ তুলে তাকালেন৷ কান্নায় ডুকরে কঁকিয়ে উঠলেন পেশায় ট্যাক্সি ড্রাইভার৷ জানালেন- লকডাউনে খুবই কষ্টের মধ্যে দিয়ে সংসার চালাচ্ছিলেন৷ যাত্রী না হওয়ায় গত কয়েকমাস আগে সেই কাজটাও গেল৷ আর মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছেন না৷ তাই স্ত্রী এবং ১২ বছরের পুত্রকে ঠাকুরপুকুরে শ্বশুরবাড়িতে রেখে এসেছেন৷ এবার চলে যাওয়ার পালা!

হতাশার সাগরে তলিয়ে যাওয়া কিংবা বাধ্য হয়ে মৃত্যুকে চৌকাঠে ডেকে আনা মানুষের যন্ত্রণার ‘রঙ’ কেমন হয়, সেটা চাক্ষুষ করলেন আলিপুর থানার সাব ইন্সপেক্টর মানস গোস্বামী৷ আত্মহননকারী ব্যক্তিটিকে অনেক বুঝিয়ে তিনি নিয়ে এলেন থানায়৷ দেওয়া হল সামান্য কিছু খাবার৷ চললো কাউন্সেলিং৷ হতাশার মেঘ কাটিয়ে ততক্ষণে আবারও চোখের কোণে ঝিলিক দিচ্ছে আশার আলো৷ কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর তাঁকে তুলে দেওয়া হল তাঁর ভাইয়ের হাতে৷ থানা থেকে নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে, যাতে অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন তিনি৷

কে বলেছে সব পুলিশ অমানবিক! কলকাতা পুলিশের উর্দিধারীরা বুক ঠুকে বলতেই পারেন, ‘‘উর্দির আড়ালেও একটা সু-মন আছে, যে মন সবসময় মানুষের হয়েই কাজ করে৷’’