উৎকর্ষ বাংলা প্রকল্পের নামে কোটি টাকার প্রতারণা, সর্বস্বান্ত দুই ব্যবসায়ী

0
1202

স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: রাজ্য সরকারের প্রকল্পের নামে প্রতারণা। যার শিকার হয়েছেন কলকাতার দুই ব্যবসায়ী। খোয়া গিয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপার্জনের আশায় সর্বস্ব বিনিয়োগ করে এখন সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। প্রতারণার শিকার হওয়া এই দুই ব্যবসায়ী হলেন জয়দেব সিনহা এবং মণিদীপা বসু।

ঘটনার সূত্রপাত বছর খানেক আগে। আবাসন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঢাকুরিয়ার বাসিন্দা এই দুই ব্যবসায়ী। কিন্তু ওই ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ার কারণে নতুন কিছু করার কথা ভেবেছিলেন। তখনই আলাপ হয় হাওড়া জেলার বাসিন্দা শিবশঙ্কর গুপ্তের সঙ্গে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরামর্শ দেয় ওই শিবশঙ্কর। জয়দেববাবু অভিযোগ করেছেন যে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফ্র্যানচাইজি নিয়ে ভালো উপার্জন করা সম্ভব বলে প্রস্তাব দেয় শিবশঙ্কর। এই কারবারে নিজের পুরনো অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও দাবি করেছিল সে।

- Advertisement -

প্রতারণার শিকার হওয়া কলকাতার দুই ব্যবসায়ীকে বোঝানো হয়েছিল যে, রাজ্য সরকারের উৎকর্ষ বাংলা প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে উপার্জন করা সম্ভব। এমনই অভিযোগ করেছেন জয়দেব সিনহা এবং মণিদীপা বসু। তাঁরা আরও জানিয়েছেন যে এই প্রকল্পের অধীনে রাজ্যের যুবক-যুবতীদের নানাবিধ হাতের কাজ শেখানো হয়ে থাকে। প্রশিক্ষণের সময়ে কাজ শিখতে আসা ছেলেমেয়েদের ভাতা দেওয়ার প্রথাও রয়েছে। মূলত সরকার পক্ষ থেকেই এই প্রকল্পের যাবতীয় ব্যয়ভার গ্রহণ করা হয়ে থাকে। যে বেসরকারি সংস্থা প্রকল্পের দায়িত্ব নেয় তাঁর দায়িত্ব থাকে সমগ্র প্রকল্প বাস্তবায়িত করা। কাজের শেষে এককালীন টাকা দেওয়া হয় রাজ্যের শ্রমমন্ত্রকের পক্ষ থেকে।

এমনই পরিকল্পনা নিয়ে পুরুলিয়া জেলার মানবাজার এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ শিবির খুলেছিলেন জয়দেব সিনহা। এই প্রকল্পের জন্য স্বনির্ভর চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সঙ্গে একটি চুক্তিও হয়েছিল তাঁদের। জয়দেব সিনহা জানিয়েছেন যে প্রথমে একটি বাড়ি দেখা হয়েছিল। সেখানে ডেকরেশনের কিছু কাজও হয়েছিল। কিন্তু সেই জায়গা বদল করা হয় শিবশঙ্করের পরামর্শে। সেখানে একগুচ্ছ টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। এরপরে অন্য একটি বিয়ে বাড়ির লজ দেখা হয়। সেখানেই কাজ শুরু হয়। সেই জায়গার ডেকরেশনের জন্যেও বিস্তর খরচ হয়েছে। পরে ভেরিফিকেশনের পরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়। কর্মীদের নিয়োগ করা হয়। অনেক ছেলেমেয়ে নিজেদের নাম রেজিস্ট্রেশন করে। ক্লাস শুরুও হয়েছিল। কিন্তু লজের মালিক শুভম কুণ্ডুর বিরোধিতা করতে শুরু করে। যার পিছনে শিবশঙ্কর গুপ্তের মদত ছিল বলে অভিযোগ করেছেন জয়দেববাবু।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসা ছেলেমেয়েদের মধ্যে নানা উপায়ে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছিল বলে দাবি করেছেন জয়দেব সিনহা। এরপরে একাধিকবার কর্মীদের মারধোর করাও হয়েছিল। শিবশঙ্কর গুপ্তের সঙ্গে যোগসাজশ করে সমগ্র কেন্দ্রটির দখল নেওয়ার উদ্দেশ্যেই শুভম কুণ্ডু ওই কাজ করেছিল বলে দাবি করেছেন জয়দেব। তিনি বলেছেন, “একমাসের মধ্যে দু’বার আমাদের কর্মীদের গায়ে হাত তোলা হয়েছিল। মানবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কোনও ব্যাবস্থা নেয়নি। আমরাও আর ওখানে যায়নি।”

ব্যবসায় জয়দেববাবুর সহযোগী ছিলেন তাঁর বন্ধু মণিদীপা। তিনি বলেছেন, “এই কয়েক বছরে আমাদের প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ হয়েছে। চুক্তি, রেজিস্ট্রেশন, লজ ভাড়া, ড্রাইভারের মাইনে সব দিতে হয়েছে। পুরুলিয়ায় আমাদের পাশাপাশি স্টাফদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করেছিলাম। শিবশঙ্কর গুপ্তও আমাদের টাকাতেই খাওয়া-দাওয়া এবং সব জায়গায় যাতায়াত করেছে।” একই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, “আমরা খরচ করে এখন নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমাদের নামেই মিথ্যা রটনা রটিয়েছে। আমরা নাকি ফ্রড। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন প্রচার চালিয়েছে।”

এই বিষয়ে অভিযুক্ত শিবশঙ্কর গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সে প্রথমে সমগ্র বিষয়টি অস্বীকার করে। সাফ জানিয়ে দেয় যে কোনও প্রশিক্ষণ শিবির খোলাই হয়নি। প্রতারণার প্রশ্নই ওঠে না। কিছুক্ষণ পরে আবার বলে যে প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়ছিল। কিন্তু কোনও সরকারি ছাড়পত্র ছিল না। সেই সঙ্গে তার পালটা অভিযোগ, “জয়দেব সিনহা আমাদের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিল। কিন্তু পরে শুনি মানবাজারের অনেক লোকের টাকা মেরে পালিয়েছে।”

শিবশঙ্কর গুপ্তের সঙ্গে কথা হওয়ার পরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে খাস খবরের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে লজের মালিক শুভম কুণ্ডু। তার মুখেও শোনা যায় জয়দেব সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ। আর্থিক প্রতারণার অভিযোগও করেছে সে। এই বিষয়ে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে বলেও দাবি করে শুভম। সেই অভিযোগের কোনও নথি অবশ্য দেখাতে পারেনি শুভম। পালটা তাকে প্রশ্ন করা হয় আচমকা খাস খবরের সঙ্গে যোগাযোগ কেন? এই প্রতিবেদকের ফোন নম্বর কোথা থেকে জোগার হল? প্রথমে সে জানায় ইন্টারনেট থেকে পেয়েছে। তারপরে বলে, “যার থেকে নম্বর পেয়েছি সেটা বলা যাবে না।” আচমকা এত দিন পরে যোগাযোগ কেন? এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দূরের কথা কোনও উত্তর দিতে পারেনি সে।

পালটা অভিযোগ শুনে জয়দেব সিনহা বলছেন, “আমার তো কারোর থেকে টাকা নেওয়ার কথা ছিলই না। যা পাওয়ার ছিল সেটা সরকারের থেকে পেতাম। আমি তো শুধু খরচই করে গিয়েছি। আমি কোন উপায়ে প্রতারণা করব?” সরকারি ছাড়পত্র পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেছেন, “ছাড়পত্র ছিল বলেই আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম সরকারি পোর্টালে উঠেছিল। তারপরেই ছেলেমেয়াদের থেকে রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছিল। শিবশঙ্করের সংস্থার নামে ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া শুরু হতেই আমরা পিছিয়ে আসি।”