৩৫০ বছরের পুরনো এই পুজোয় টানা ৩ দিন ধরে হোম চলে, মায়ের মাত্র দুই হাত বড়

দুর্গাপুজোর নামে উড়ু উড়ু করে ওঠে যে কোনও বাঙালির মন। তবে কেউ কেউ পুজোর চারটে দিন একটু অন্যরকমভাবেও কাটাতে পছন্দ করেন। তারা ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের বাঙালিয়ানাটাও চান। এইসকল ব্যক্তিবর্গের জন্য খাস খবরের তরফে থাকছে বাংলার কিছু অভিজাত বাড়ির ঠিকানা।

0
70

বিশ্বদীপ ব্যানার্জি: কীর্ণাহার, শব্দটি কানে গেলে সবার প্রথমে একটি নামই মনের কোণে ভেসে ওঠে। তা হল, প্রণব মুখোপাধ্যায়। কিন্ত আপনি যদি এলাকার কোনও বাসিন্দাকে প্রশ্নটি করেন, তারা কিন্তু কেবলমাত্র ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি কিংবা তাঁর পরিবারের নাম করবেন না। বরং জানাবেন সরকার পরিবার (Kirnahar Sarkar Bari) আর তাঁদের ৩৫০ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোর কথাও।

আরও পড়ুন: পরিত্যক্ত ছোলা বিক্রি করে জমিদার দু’ভাই, অষ্টমীতে বিতরণ করতেন ৪০ মণ মিষ্টি

- Advertisement -

এই পরিবারের-ই অন্যতম সদস্য অঞ্জন সরকার। খাস খবরকে অঞ্জনবাবু জানালেন, তাঁদের প্রকৃত পদবী সরকার নয়। আসলে তাঁরা ছিলেন অবিভক্ত বাংলায় ময়মনসিংহের অধিবাসী, সে সময় গঙ্গোপাধ্যায় পদবী ধারণ করতেন। ক্রমে রাজা মান সিংহ তাঁদের বীরভূমে জায়গীর প্রদান করেন। এবং তিনিই এই ‘সরকার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

অন্যদিকে পরিবারের আরেক সদস্য রাজা সরকারের কথা থেকে জানা গেল, কিশোর কুমার সরকার নামের তাঁদের যে পূর্বপুরুষ কীর্ণাহারে বসবাস শুরু করেন, তিনিই এই পুজোর প্রচলনকারী। বর্তমানে এই পুজো সরকারদের পুজো নামে পরিচিত, সাড়ে তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও যার আচারে নেই এতটুকু খামতি।

প্রথা মেনে আজও মহালয়ার পরদিন অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে শুরু হয় পুজো। তিথি অনুযায়ী দেবীকে ভোগ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু। অঞ্জনবাবুর কথায়, “প্রতিপদ, দ্বিতীয়া এবং তৃতীয়ায় ৪০ কেজি চালের ভোগ দেওয়া হয়। এরপর চতুর্থী, পঞ্চমী এবং ষষ্ঠীতে ৬০ কেজি চালের ভোগ রান্না হয়। আর সবশেষে সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী ৭০ কেজি থেকে ১ কুইন্টাল চালের ভোগ হয়।” অন্যদিকে রাজাবাবু জানালেন আরও একটি বিশেষ আচারের কথা। অন্যান্য জায়গায় সাধারণতঃ নবমীর দিন হোম হয়ে থাকে। কিন্তু রাজাবাবু জানালেন, “আমাদের এখানে অতন্দ্র হোম হয়। যা সপ্তমীর দিন শুরু হয়ে চলে নবমী পর্যন্ত।”

একচালার দেবী প্রতিমাতেও বিশেষত্ব রয়েছে বৈকি। এই বাড়ির দুর্গা দশভুজা হলেও তাঁর দুটি হাত বেশি বড়, বাকি ৮ হাত ছোট। তাছাড়া একমাত্র কার্তিকের ময়ূর ছাড়া আর কোনও বাহনকে দেখা যায় না। এমনকি দেবীর বাহন সিংহ-ও নেই, বদলে থাকে নরসিংহ। এই পুজোতে বলির প্রথা প্রচলিত। রাজা সরকার জানালেন, “ছাগবলি এবং কুমড়ো বলি, দু’রকম বলি-ই হয়।” তিনি এও জানালেন, পাশাপাশি দেবীর উদ্দেশ্যে মাছভোগ-ও নিবেদন করা হয়ে থাকে।

Kirnahar Sarkar Bari

এদিকে ৩৫০ বছরের দুর্গাপুজো ছাড়াও সরকার বাড়ির আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তা জগদ্ধাত্রী পুজোর কারণে। রাজা মান সিংহের আরাধ্যা জগদ্ধাত্রী প্রতিষ্ঠিত এই বাড়িতে, আর তিনিই সরকারদের কুলদেবী। তবে দুর্গাপুজো ঠিক বাড়ির ভেতরে হয় না‌। সামনেই একটি চণ্ডীমণ্ডপ, সেখানে হয়। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেল, আগে একটি ঠাকুর দালান ছিল। সেটি ভেঙে যাওয়ার পর পরিবারের সকল সদস্যরা চাঁদা তুলে এই চণ্ডীমণ্ডপটি নির্মাণ করিয়েছেন।

দশমীর বিসর্জনেও রয়েছে এক চমকপ্রদ রীতি। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, বিসর্জনের আগে দেবীকে বহন করে নিয়ে যান এলাকার হাড়ি-বাগদি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষজন। তারা নাকি এ সময় এক অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন সরকার বাড়ির সদস্যদের উদ্দেশ্যে। কারণটা আর কিছুই নয়। সরকাররা এককালে ছিলেন এ অঞ্চলের জমিদার। সে সময় এই সমস্ত সম্প্রদায় ছিল তাদের প্রজা। যদিও সরকাররা রক্তচোষা জমিদার ছিলেন এমনটা কেউই বলতে পারবেন না, তবু কার্যত অতীতের জমিদারি প্রথার বিরোধিতা করতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন হাড়ি-বাগদিরা। মজার বিষয় হল, বিসর্জন হয়ে যেতেই এরা রাতারাতি আমূল বদলে যান। তখন তারা হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চান সরকার বাড়ির সদস্যদের।

খাস খবর ফেসবুক পেজের লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/khaskhobor2020/

কীর্ণাহারের সরকার বাড়ির (Kirnahar Sarkar Bari) আরও একটি মাহাত্ম্য রয়েছে সমগ্র অঞ্চলের নিরিখে। একদা এ বাড়িতে পদধূলি পড়েছে একাধিক বরেণ্য ব্যক্তিত্বের। অঞ্জনবাবুর কথায়, এ বাড়িতে সাহিত্য পরিষদের অধিবেশন-ও বসেছে। তখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিদ্যাসাগর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা এসেছিলেন। এছাড়া এই বাড়িতে সাধক বামাক্ষ্যাপা-ও এসেছিলেন বলে শোনা যায়।